সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিগগিরই দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভেতরে যাঁরা অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন, তাঁদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও প্রকাশ করেন যে, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁকে ইতিমধ্যে অন্তত দুইবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর তীব্র তাগিদের মুখে পড়তে হয়েছে।
শনিবার (৬ জুন ২০২৬) বেলা তিনটায় জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই কড়া বার্তা দেন। প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই নীতি-নির্ধারণী সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এই জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হলো।
ঘাটতি বাজেট হলেও প্রবাসীরা সুন্দর বাজেট পাবেন: প্রধানমন্ত্রী
সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্যের সূত্র অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধবিগ্রহসহ নানাবিধ বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যেই একটি বিশাল অঙ্কের ঘাটতি বাজেট দিয়ে বর্তমান সরকারকে যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে। তবে তিনি সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সুন্দর বাজেট পাবেন, আপনারা সন্তুষ্ট হবেন’।
বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থমন্ত্রী টানা ৪৮ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাজেট তৈরি করেছেন এবং তিনি নিজেও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে টানা ১৭ ঘণ্টা একসঙ্গে বসে কাজ করেছেন।
উসকানি ও বিভ্রান্তির বিষয়ে সতর্কবার্তা: প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, বাজেট পেশ করার পর বিরোধী দল স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাজেট নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা ছড়ানো হতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে এবং যেকোনো পরিস্থিতি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদীয় কাজে দক্ষ হওয়ার পরামর্শ ও মন্ত্রিসভায় রদবদলের ইঙ্গিত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদীয় দলের এই সভার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের নিয়মিত আলোচনার মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্ব, মন্ত্রীদের জবাব দেওয়ার কৌশল এবং সরকারের জবাবদিহির সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে একটি বড় ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় কোনো রদবদল বা সম্প্রসারণ করা হলে, সংসদীয় কাজে দক্ষ প্রার্থীরাই এখান থেকে স্থান পাবেন। তিনি সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যক্রমে পূর্ণ সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেন。
৩৬ নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে বিরোধী দলের আসনের দায়িত্ব বণ্টন
সংসদীয় দলের এই সভায় সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির ৩৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন এবং তাঁদের কেউ কেউ বক্তব্য প্রদান করেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ৩৬ জন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে আসনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। কাউকে একটি, কাউকে দুটি, আবার কাউকে সর্বোচ্চ চারটি আসনের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, যেসব আসনে বর্তমানে বিরোধী দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, সেই এলাকাগুলোতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে নারী সংসদ সদস্যদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটি নিয়ে চুক্তি বাতিলের দাবি
সভায় চট্টগ্রাম-১ আসনের একজন সংসদ সদস্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) নিয়ে কথা বলেন। তিনি দুবাইভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বন্দর অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ (DP World)-এর সঙ্গে এনসিটির চলমান ইজারা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাতিল করার জোরালো দাবি জানান।
ওই সংসদ সদস্যের যুক্তি, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই এনসিটি সম্পূর্ণ সফলভাবে পরিচালনায় সক্ষম। সরকার যদি টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য কোনো বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দিতেই চায়, তবে তা নতুন কোনো টার্মিনালে দেওয়া হোক, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে নয়। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, এনসিটি স্থাপন ও উদ্বোধনের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, তাই এটি কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া সমীচীন হবে না।
সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের মুখোমুখি মন্ত্রীরা
সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন। তাঁরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংসদীয় দলের সামনে তুলে ধরেন এবং সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে জোরালো দাবি:
-
শিক্ষার সংকট: বিএনপির সংসদ সদস্যরা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পাশাপাশি দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং প্রতিটি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষকের তীব্র ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য হিন্দুধর্ম শিক্ষকের সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য।
-
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন: স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সংসদ সদস্যরা দাবি করেন, সব উপজেলায় ১০১ শয্যার হাসপাতাল করার সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়নের আগেই, বর্তমানে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর তীব্র জনবলসংকট দূর করতে হবে।
-
পিপিপি (PPP) মডেলের আভাস: একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও মান বাড়াতে সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি বিনিয়োগ বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (PPP) চালুর বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (সাবেক পিজি হাসপাতাল) কিছু নির্দিষ্ট সেবা আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই পাইলট উদ্যোগটি শুরু হতে পারে।







