ওমান সংলাপে নতুন মোড়: পারমাণবিক প্রকল্প ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে মুখোমুখি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা থামিয়ে কূটনীতির পথ সুগম করতে কাতার, তুরস্ক ও মিশর একটি নতুন ও বৈপ্লবিক প্রস্তাবনা হাজির করেছে। আগামী শুক্রবার ওমানে অনুষ্ঠেয় এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই রূপরেখা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে, যেখানে অংশ নেবেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইতিপূর্বে এই আলোচনা তুরস্কে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা ওমানের মাস্কাটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ। মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া খসড়া অনুযায়ী, ইরান আগামী তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনবে এবং পরবর্তী সময়ে এই সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কোনোভাবেই ১.৫ শতাংশের উপরে যাবে না। বর্তমানে তেহরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ মাত্রার সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও এই নতুন কাঠামোর অন্যতম শর্ত।

তবে এই আলোচনার পরিধি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না বরং এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের কোনো ধরনের অস্ত্র বা উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ না করার অঙ্গীকার করতে হবে। এছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা আরও সুনির্দিষ্টভাবে কমিয়ে আনতে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে দুই দেশের মধ্যে একটি অ-আগ্রাসন চুক্তি বা ‘নন-অ্যাগ্রেশন এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের পরিকল্পনাও মধ্যস্থতাকারীরা পেশ করেছেন। যদিও তেহরান এখন পর্যন্ত কেবল পারমাণবিক ইস্যু এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়েই এককভাবে কথা বলতে আগ্রহী, তবুও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবনাকে এক বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই কূটনৈতিক তোড়জোড় এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন আরব সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি এবং যুদ্ধবিমানের অবস্থান ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। দেশের ভেতরে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পড়া তেহরান এখন এক অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইজরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ এই আলোচনাকে আরও বেশি জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অতীতের চুক্তি থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বেরিয়ে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক দফা সীমিত সামরিক সংঘাতের পর ওমানের এই বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার শেষ সুযোগ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top