বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে- স্বাস্থ্যমন্ত্রী
 

 

১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল, সাপে কাটার ওষুধ ও পর্যাপ্ত স্যালাইন প্রস্তুত: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলমান ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি জেলার সব পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বন্যাকবলিত এলাকার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব কথা জানান।

১১ জেলাকে বিশেষ বন্যাকবলিত চিহ্নিত করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের দায়িত্ব

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কয়েক দিনের অতিভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও সরকার দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠে নেমেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ১১টি জেলাকে বিশেষভাবে বন্যাকবলিত হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

  • বিশেষ তদারকি: প্রতিটি জেলার সার্বিক চিকিৎসাসেবা নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে (সিনিয়র ফিজিশিয়ান) সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ করছে।

  • ঝুঁকি নিয়ে সেবা: একটি বন্যাকবলিত এলাকার হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়লে গত রাতেই সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন এবং চিকিৎসাসেবা সচল রেখেছেন।

  • গর্ভবতী ও শিশুদের অগ্রাধিকার: জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু এবং দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সবার আগে নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাপে কাটা রোগী ৯৫ জন, অ্যান্টিভেনম সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই

বন্যার সময় সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বন্যার প্রথম রাতে পাঁচজন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের দ্রুত অ্যান্টিভেনম দেওয়ায় সবাই সুস্থ আছেন। মানুষ যেন ওঝার কাছে গিয়ে জীবন বিপন্ন না করে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে আসেন, সেই আহ্বান জানাচ্ছি।”

সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান:

“সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে এখন পর্যন্ত সাপে কাটা মোট ৯৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং আল্লাহর রহমতে প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন। বর্তমানে আমাদের কাছে ১ হাজারের বেশি ভায়াল অ্যান্টিভেনম জরুরি মজুত রয়েছে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে আরও ২১ হাজার ভায়াল সংরক্ষণ করা আছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২৫ হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম সরকারের স্টোরে যুক্ত হবে। ফলে দেশে অ্যান্টিভেনম সংকটের কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই।”

পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ ও বন্যাপরবর্তী প্রস্তুতি

স্বাস্থ্যসচিব আরও জানান, বন্যা চলাকালীন এবং বন্যাপরবর্তী সময়ে ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব রুখতে পর্যাপ্ত ওআরএস (খাবার স্যালাইন), জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও বিশেষ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট মেটাতে লাখ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (ডব্লিউপিটি) বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক হলে রোগীদের দ্রুত উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের (রেফার) ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কল সেন্টার ১৬২৬৩ নম্বর এবং স্বাস্থ্য বাতায়নের মাধ্যমে বন্যাকবলিত এলাকার যেকোনো নাগরিক দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শ ফ্রিতে নিতে পারছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় যাতে ডেঙ্গু ও অন্য কোনো সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে না পড়ে, সেটিও ঢাকা থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পরিশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “সরকারের লক্ষ্য একটাই, বন্যার কারণে দেশের একটি মানুষও যেন চিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারান।” এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি দেশের গণমাধ্যমেরও সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top