নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার যে অত্যন্ত বিতর্কিত ও উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তীব্র সমালোচনার মুখে তা থেকে শেষ মুহূর্তে সরে আসছে সরকার। ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক আপত্তি ও উদ্বেগের কারণে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৯ জুন (সোমবার) জাতীয় সংসদে পাস হতে যাওয়া অর্থবিলে এই বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) সনদ জমা দেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন থাকছে না।
গ্রাহক আতঙ্ক ও ব্যাংকিং খাত থেকে দূরে সরে যাওয়ার শঙ্কা
প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছিল, নতুন যেকোনো ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হবে (শুধুমাত্র শিক্ষার্থী, ১০ টাকার বিশেষ হিসাব এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী ছাড়া)। তবে টিআইএন গ্রহণ করার অর্থই হলো বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করা। করযোগ্য আয় না থাকলেও বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে প্রতিবছর এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যা গ্রামীণ ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখই সঞ্চয়ী (সেভিংস) হিসাব।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী এই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন:
“দেশের অনেক মানুষের এখনও টিআইএন নেই এবং এটি খোলাও সাধারণ মানুষের কাছে সহজ বিষয় নয়। ফলে বাজেট ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে। এটি জোরপূর্বক কার্যকর করা হলে সাধারণ মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল পরিহার করে সমবায় বা অন্য বিকল্প অনুন্নত অপ্রাতিষ্ঠানিক নগদ লেনদেনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারত।”
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন যে, ব্যাংক খাতের বর্তমান তারল্য ও সার্বিক বাস্তবতায় সরকার এমন কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে চায় না, যাতে গ্রাহকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যায়। করজাল সম্প্রসারণ করা জরুরি হলেও তা বাস্তবসম্মত উপায়েই করা হবে।
শুধু টিআইএন নয়, কাজুবাদাম ও বিজ্ঞাপনী করের হারেও পরিবর্তন
২৯ জুনের অর্থবিলে শুধু টিআইএন-ই নয়, প্রস্তাবিত বাজেটের আরও কয়েকটি আলোচিত ও সমালোচিত শুল্ক-করেও সীমিত সংশোধনের ইঙ্গিত মিলেছে:
-
কাঁচা কাজুবাদামের শুল্ক হ্রাস: প্রস্তাবিত বাজেটে খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট মিলিয়ে মোট ট্যাক্স প্রায় ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু দেশে উৎপাদন কম থাকায় স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সুরক্ষায় চূড়ান্ত বাজেটে কাঁচা কাজুবাদামের শুল্ক কমানো হচ্ছে এবং বিদেশ থেকে আসা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর সুরক্ষামূলক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে।
-
বিজ্ঞাপনী সংস্থার উৎসে করের স্বস্তি: প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সির বিল পরিশোধের সময় উৎসে কর ০.৬৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট খাতের তীব্র আপত্তির মুখে এই উৎসে করের হারও চূড়ান্ত বাজেটে কমানো হচ্ছে।
সামগ্রিক অর্থনীতি ও মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিত
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজেট পাস করার প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। ফলে বাজেটের সামগ্রিক আকার, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহে কোনো বড় ও মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) কর সুবিধা, নির্দিষ্ট আমদানি পণ্যের শুল্ক সমন্বয়, প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের কর রেয়াত এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের কিছু কর অবকাশ (Tax Holiday) বহাল রাখার মতো বাস্তবমুখী সংশোধন আনা হচ্ছে।
রিসার্থ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এম এ রাজ্জাক বলেন, “সরকারের উচিত ব্যাংক হিসাবধারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিশাল অর্থনীতিকে করের আওতায় আনা। ব্যাংক হিসাবের ওপর জোর দিলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) নীতি বড় ধাক্কা খাবে।” একই সুরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নজর এখন ৩০ জুনের কণ্ঠভোটের দিকে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে শুক্রবার রাতে দেশে ফিরেছেন। সরকারপ্রধানের সবুজ সংকেত মেলার পরপরই এনবিআর এই সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। আগামী ২৯ জুন অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্কসংক্রান্ত এই ঐতিহাসিক সংশোধনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে। এর পরদিন, অর্থাৎ ৩০ জুন (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেট পাস হবে।







