ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি লক্ষ্যণীয় ধস
 

 

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে বড় ধস: ৪ মাসেই ক্ষতি প্রায় ১.৪৭ বিলিয়ন ইউরো

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প ইউরোপের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া এই খাতের সবচেয়ে বড় একক বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কিন্তু চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসের বাণিজ্য পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য এক চরম উদ্বেগের বার্তা নিয়ে এসেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ, যা দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত প্রস্তুতিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’ (Eurostat)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আশঙ্কাজনকভাবে ১৯.৪ শতাংশ কমেছে। একই সাথে প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার অংশীদারত্ব (মার্কেট শেয়ার) হারিয়েছে বাংলাদেশ।

১.৪৭ বিলিয়ন ইউরোর বড় ধাক্কা ও বাজার সংকোচন

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে ৬.০৯ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। অথচ ২০২৫ সালের ঠিক একই সময়ে এই রফতানির পরিমাণ ছিল ৭.৫৫ বিলিয়ন ইউরো

  • আয় হ্রাস: মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বাজার থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে প্রায় ১.৪৭ বিলিয়ন ইউরো (১৯.৪ শতাংশ)।

  • মার্কেট শেয়ারে পতন: চলতি বছরে বৈশ্বিক মন্দার কারণে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ১০.৪ শতাংশ। বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশ হারিয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে। ২০২৫ সালের প্রথম ৪ মাসে ইইউর মোট আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৪.৪ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২১.৯ শতাংশে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে বাংলাদেশ ২.৫ শতাংশ পয়েন্ট বাজার হারিয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে যেকোনো প্রধান সরবরাহকারী দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন।

শীর্ষ প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানি চিত্র (জানুয়ারি-এপ্রিল ২০২৬)

বিশ্ববাজারে চাহিদা কমলেও সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বাংলাদেশের তুলনায় চীন ও ভিয়েতনাম অনেক বেশি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে:

দেশের নাম ২০২৬-এর রফতানি (৪ মাসে) পতনের হার (%) মার্কেট শেয়ারের বর্তমান চিত্র
চীন (১ম স্থান) $৭.৯৫ বিলিয়ন ইউরো -৪.৬% ২৬.৯% থেকে বেড়ে ২৮.৬% হয়েছে
বাংলাদেশ (২য় স্থান) $৬.০৯ বিলিয়ন ইউরো -১৯.৪% ২৪.৪% থেকে কমে ২১.৯% হয়েছে
ভিয়েতনাম তুলনামূলক স্থিতিশীল -০.৭% ৪.৪% থেকে বেড়ে ৪.৯% হয়েছে
পাকিস্তান -১৭.৯% নিটওয়্যার খাতে বড় পতন (-২২.১%)
তুরস্ক -১৬.৯% ভৌগোলিক সুবিধা সত্ত্বেও বাজার হারিয়েছে
ভারত -১২.১% ইইউর গড় আমদানির সমহারে কমায় স্থিতিশীল

নিটওয়্যার ও ওভেন: দুই খাতেই যুগপৎ ধস

বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান দুটি স্তম্ভই ইউরোপের বাজারে একসঙ্গে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে, যা প্রমাণ করে সংকটটি সামগ্রিক:

  • নিটওয়্যার রফতানি: ২০.১ শতাংশ কমে ৪.৩২ বিলিয়ন ইউরো (২০২৫) থেকে ৩.৪৫ বিলিয়ন ইউরোতে (২০২৬) নেমে এসেছে।

  • ওভেন পোশাক রফতানি: ১৮.৪ শতাংশ কমে ৩.২৩ বিলিয়ন ইউরো থেকে ২.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।

মাসভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বছরের শুরুতেই জানুয়ারিতে রফতানি কমেছিল ২৫ শতাংশের বেশি। ফেব্রুয়ারি (-১২.৫%), মার্চ (-১৯.২%) ও এপ্রিলে (-১৯.৫%) ধারাবাহিকভাবে এই পতন অব্যাহত রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে ইউরোপের ক্রেতারা এখন বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।

শুধু অর্ডার নয়, কমেছে পোশাকের গড় দামও (ইউনীত প্রাইস)

রফতানি কমার পেছনে আরেকটি বিপজ্জনক কারণ হলো তৈরি পোশাকের ইউনিট মূল্য বা গড় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া। মার্চ ২০২৫ ও মার্চ ২০২৬-এর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, রফতানির পরিমাণ কমেছে মাত্র ৩.২৯ শতাংশ, কিন্তু ইউনিট মূল্য বা গড় দাম কমে গেছে ১৬.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও অর্ডার ধরে রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা নিজেদের পণ্যের ওপর ব্যাপক মূল্যছাড় (ডিসকাউন্ট) দিতে বাধ্য হয়েছেন।

কেন কমছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা?

রফতানির এই বড় পতনের পেছনে বৈশ্বিক মন্দার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বহুমুখী সংকটকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ও শিল্প মালিকেরা।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন:

“বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব তো আছেই। তবে আমাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর সাথে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা আমাদের লিড-টাইমকে (পণ্য সরবরাহের সময়) ব্যাহত করছে।”

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভিয়েতনাম যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (EUVFTA), পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য তৈরি করে বাজার ধরে রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। তিনি উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর সংস্কার এবং মূল্যসংযোজনকারী (Value-added) পণ্যের দিকে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

২০২৯ সালের এলডিসি উত্তরণের আগে বড় সতর্ক সংকেত

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপের বাজারের এই ধস বাংলাদেশের জন্য একটি চূড়ান্ত ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্ক সংকেত। ২০২৯ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে। এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা (EBA) আর থাকবে না। তখন ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে চড়া শুল্ক দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

যদি এখনই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বন্দর সংস্কার এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করা না যায়, তবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top