রাজস্বের খোঁজে গ্রামে যাচ্ছে এনবিআর; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আসছে ‘টোকেন ভ্যাট’

দেশের রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়াতে এবং কর-জিডিপি অনুপাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটাতে এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করের জাল দেশের উপজেলা ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা। বর্তমানে বাংলাদেশের বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি কর কাঠামোর বাইরে থাকায় এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

পরিকল্পনার মূল দিকসমূহ:

  • টোকেন ভ্যাট প্রবর্তন: ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর প্রদানে অভ্যস্ত করতে মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার একটি সহজ ‘টোকেন ভ্যাট’ ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। এটি প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে বলে মনে করা হলেও অতীতে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থায় হওয়া দুর্নীতি ও হয়রানি রোধ করাই হবে এর প্রধান চ্যালেঞ্জ।

  • বিআইএন (BIN) বাধ্যতামূলক: ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা বিআইএন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১.১৭ কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট থাকলেও এর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দেয়।

  • ভৌগোলিক বৈষম্য দূরীকরণ: বর্তমানে মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই রাজস্ব বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত:

জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটি অবশ্যই স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হতে হবে, নতুবা এটি হিতে বিপরীত হতে পারে। ব্যবসায়ী নেতারাও হঠাৎ করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করার ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:

এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে নির্ভুল তথ্যের অভাব এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৪ থেকে ৫ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এটি কার্যকর করা সম্ভব। সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেমন রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, তেমনি দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top