ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের যে আনুষ্ঠানিক চিত্র নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হার ঘোষণা করা হয়। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনসমর্থনের দৌড়েও সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ২৯০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ধানের শীষ প্রতীকে দলটি মোট ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ অর্জন করেছে, যা দেশজুড়ে দলটির একক আধিপত্যের প্রমাণ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পর নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে ফেরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের জনপ্রিয়তার এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। ২২৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে দলটি মোট ভোটের ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ লাভ করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির বিপুল জয়ের মাঝেও জামায়াতের এই উচ্চ শতাংশের ভোট প্রাপ্তি দলটিকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াত মিলে দেশের মোট ভোটের প্রায় ৮২ শতাংশ নিজেদের থলিতে পুরেছে, যা দেশের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে মাত্র ৩২টি আসনে প্রার্থী দিয়েও তারা ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। নবীন একটি দলের জন্য এত অল্প আসনে লড়ে তিন শতাংশের বেশি ভোট পাওয়াকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক উত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ঠিক বিপরীতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংসদের বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির চরম ভরাডুবি ঘটেছে। ১৯৯টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকে লড়াই করেও দলটি ১ শতাংশের ঘর ছুঁতে পারেনি। তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা দলটির অস্তিত্বকে এক গভীর সংকটে ফেলেছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইসলামী দলগুলোর অবস্থানও বেশ নজরকাড়া ছিল। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৭টি আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এছাড়া ১১-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রিকশা প্রতীকে ৩৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে। তবে বামপন্থী ও অন্যান্য ছোট দলগুলোর জন্য এই নির্বাচন ছিল বেশ হতাশাজনক। সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ, গণফোরাম ও নাগরিক ঐক্যের মতো পরিচিত দলগুলোর প্রত্যেকেই ১ শতাংশের নিচে ভোট পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, ভোটাররা এবার প্রধান ও শক্তিশালী পক্ষগুলোকেই বেছে নিয়েছেন, যেখানে তৃতীয় কোনো বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার চেষ্টা করছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এনসিপি।







