সংসদের প্রধান বিরোধী নেতা ডা. শফিকুর রহমান; উপনেতা পদে তরুণ তুর্কি নাহিদ ইসলামের হাতছানি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এক বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার পদ। জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতার আসন অলঙ্কৃত করতে যাচ্ছেন। একজন পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন, যা দলটির ইতিহাসে এক অভাবনীয় মাইলফলক।

তবে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতুহল তৈরি হয়েছে। এই পদের জন্য এখন পর্যন্ত চারজনের নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। জোটের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার নাহিদ ইসলাম এই তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘সেনাপতি’ হিসেবে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ১১-দলীয় জোট। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, নাহিদ ইসলামকে উপনেতা করলে তা কেবল জোটের ঐক্যের প্রতীকই হবে না, বরং নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। তবে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় দলটির তিনজন নায়েবে আমিরের নামও রয়েছে। এঁদের মধ্যে ১৯৮৬ সালের সংসদের অভিজ্ঞ নেতা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। তালিকায় আরও রয়েছেন কারামুক্ত বর্ষীয়ান নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং জনপ্রিয় নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা এ টি এম মাসুম জানিয়েছেন যে, সংসদের এসব পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে জোটের শরিকদের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ১১-দলীয় জোটের সংহতি বজায় রাখার স্বার্থে পদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও দলের রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেলেও এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন। প্রাপ্ত ভোটের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশের রাজনীতিতে নিজেদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটব্যাংক হিসেবে প্রমাণ করেছে। এই ভোট ও আসনের আনুপাতিক হার অনুযায়ী, দলটি সংরক্ষিত নারী আসনে আরও ১৩টি এবং প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে ২৭টি আসন পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসন পাওয়া একটি দলের এমন উত্থান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়।

নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, জামায়াত অন্তত ৫৩টি আসনে মাত্র দুই হাজার বা তারও কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। দলের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের দাবি করেছেন যে, ফলাফল পরিবর্তন বা ‘টেম্পারিং’ না হলে তাঁদের আসন সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত। তা সত্ত্বেও, ১৯৯১ সালে ১৭টি এবং ২০০১ সালে ১৮টি আসন পাওয়ার রেকর্ড ভেঙে এবারই প্রথমবারের মতো দলটি এত বড় সংসদীয় শক্তি নিয়ে বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত ভূমিকার পর ২০২৬ সালে এসে দলটির এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করার বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top