ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এক জাদুকরী পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা কাটিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এক ঐতিহাসিক উত্থানের সাক্ষী হলো। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে সূচকের শক্তিশালী উল্লম্ফন এবং লেনদেনের অভাবনীয় গতির মাধ্যমে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক দিনে এমন ব্যাপকভিত্তিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত উত্থান বিরল, যা মূলত একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও আগামীর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশাকেই ধারণ করছে।
দিনের শুরুতে লেনদেন শুরুর পর থেকেই বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেগবান হয়। দিন শেষে ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে স্থির হয়েছে। শুধু প্রধান সূচকই নয়, শরীয়াহ সূচক ডিএসইএস এবং বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর ডিএস৩০ সূচকও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। একদিনে বাজার মূলধন প্রায় ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের করপোরেট খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। এই বিশাল উত্থান কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রায় ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরের বৃদ্ধি প্রমাণ করেছে যে এটি একটি টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক বাজার পরিস্থিতি।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক ছিল বাজারের লেনদেনের গতি। গত পাঁচ মাসের রেকর্ড ভেঙে এদিন ডিএসইতে লেনদেন ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। বাজার সংশ্লিষ্টরা একে একটি ‘রিলিফ র্যালি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের শেয়ারগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া চাপ লক্ষ্য করা গেছে। সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বড় কোম্পানিগুলো লেনদেনের শীর্ষে থেকে বাজারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রায় ৭৫টি কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করে লেনদেন হওয়া এটিই নির্দেশ করে যে, সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন করে বাজারে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
পুঁজিবাজারের এই চমকপ্রদ আচরণের পেছনে কাজ করেছে নির্বাচনে বিএনপি জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। ইশতেহারে বর্ণিত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির আশ্বাস বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। তবে এই শুভ সূচনাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জোয়ার স্থায়ী করতে হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, তারল্য সংকট নিরসন এবং গুণগত মানসম্পন্ন নতুন আইপিও বাজারে আনা জরুরি। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত।







