বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৮ বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রূপান্তর প্রক্রিয়ার পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। নির্বাচন কমিশনের সবশেষ বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জনগণের বিপুল রায়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের নির্বাচনী জোট। দেশের মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসন স্থগিত রেখে) ২৯৭টি আসনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে এককভাবে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়েছে। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক খরা কাটিয়ে এই বিপুল বিজয়কে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনী ফলাফলের এই ঝড়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৭৭টি আসনে জয় ছিনিয়ে এনে সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসনে জয়লাভ করে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও অন্যান্য ছোট দলগুলো সব মিলিয়ে ৭টি আসনে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ছিল তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সফল আয়োজন।
ভোটের এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২১২টি আসন নিয়ে বিএনপি জোট এখন দুই-তৃতীয়াংশ মেজোরিটির দ্বারপ্রান্তে, যা তাদের জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের পথকে আরও সুগম করবে। নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন বিএনপি যে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা’ দিয়েছিল, তাকেই এ দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত জোটের ৭৭টি আসন পাওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, দেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরণের মেরুকরণ ঘটেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু গোলযোগ ছাড়া এবারের ভোট ছিল উৎসবমুখর এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনের এই ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট পাওয়ার পর এখন দেশবাসীর নজর পরবর্তী সরকার গঠনের দিকে। নতুন প্রজন্মের এই ‘বাংলাদেশে’ দীর্ঘ সময় পর একটি নির্বাচিত সরকারের পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সফল বিদায় এবং গণতান্ত্রিক ট্রেনের এই স্টেশন জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা, যেখানে ২১২ জন সদস্যের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি দেশের আগামীর কর্ণধার হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।







