যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি: নির্বাচনের মুখে তড়িঘড়ি ও গোপনীয়তার প্রশ্ন

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক-সংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। সোমবার ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা। তবে চুক্তির শর্ত গোপন রাখা, অংশীজনদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ত না করা এবং নির্বাচনের ঠিক আগে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগে দেশে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সংশয়।

মূল প্রশ্ন একটাই— এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ আসলে কতটা সুবিধা পাবে? নাকি নির্বাচনের মুখে অস্থায়ী সরকার এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার দায় ও জটিলতা ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারকেই বইতে হবে?

নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি কেন?
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের এত কাছে এসে এমন একটি বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববিশিষ্ট চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক মহল, ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, এ ধরনের নীতিগত ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়াই উচিত ছিল। কারণ চুক্তি বাস্তবায়ন, পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সরকারকেই নিতে হবে।

রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের আশঙ্কা, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো একতরফা শর্ত মেনে নেওয়া হলে পরবর্তী সরকার চুক্তি পরিবর্তন করতে গিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতায় পড়তে পারে।

শুল্ক কমার আশ্বাস, কিন্তু কতটা?
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরও কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে কতটা কমবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি শুল্ক আরও কমানোর। কতটা কমবে তা আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।”

তিনি আরও জানান, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। “গার্মেন্টস পণ্যে শুল্ক শূন্য করার চেষ্টা অব্যাহত আছে,” বলেন তিনি।

পটভূমি: পাল্টা শুল্ক থেকে দরকষাকষি-
২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ প্রায় ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামানো হয়। এর সঙ্গে আগের ১৫ শতাংশ যোগ হয়ে বর্তমান মোট শুল্কহার ৩৫ শতাংশ।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিয়েছে। ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, তুলা আমদানি বাড়ানো এবং বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গোপনীয়তা ও নন-ডিসক্লোজার বিতর্ক-
চুক্তির শর্তাবলি গোপন রাখা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক। গত বছরের ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে বাংলাদেশ। ফলে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, যে খাতগুলো সরাসরি প্রভাবিত হবে, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “চুক্তির বিষয়বস্তু আমরা জানি না। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন সিদ্ধান্ত না নিলেই ভালো হতো।”

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ:
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যারা ভবিষ্যতে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে, তারা যদি কিছুই না জানে—তাহলে জবাবদিহি থাকবে কোথায়?” দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, “এটি শুধু শুল্ক চুক্তি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। স্বচ্ছতার ঘাটতি খুবই উদ্বেগজনক।”

ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে চুক্তি পুনর্বিবেচনা সম্ভব। তবে কঠোর বাধ্যবাধকতা থাকলে তা কঠিন হবে।

চুক্তিটি সুবিধা না ঝুঁকি—এর উত্তর মিলবে শর্ত প্রকাশের পর। গোপনীয়তার আড়ালে থাকা এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়—এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার এক বড় পরীক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top