রাজশাহীর জনসমুদ্রে তারেক রহমানের ঘোষণা: পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও কৃষিঋণ মওকুফের অঙ্গীকার

রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নের এক বিস্তারিত মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি নির্ধারণ করবে দেশ প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে নাকি অন্য কোনো অনিশ্চিত গন্তব্যে যাবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি গণতন্ত্রকে সুসংহত রাখা না যায়, তবে কোনো মেগা প্রকল্পই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাজে আসবে না। তাই যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্রের ঝান্ডা সমুন্নত রাখার জন্য তিনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর রাজশাহীর মাটিতে তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে তারেক রহমান বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। ফারাক্কা ব্যারাজের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তিনি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরো উত্তরবঙ্গ সুফল ভোগ করবে। এ ছাড়া রাজশাহীর আমের বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পচন রোধে বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সম্প্রসারিত বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে বন্ধ থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই প্রকল্প পুনরায় চালু করা হবে। এর পাশাপাশি পদ্মা নদী ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাল খননের মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। প্রান্তিক কৃষকদের দুর্দশা লাঘবে তিনি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করার ঘোষণা দেন, যা উপস্থিত জনতাকে বিশেষভাবে আশান্বিত করে।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তারেক রহমান এক নমনীয় ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচয় দেন। তিনি কারো ব্যক্তিগত সমালোচনা না করে বলেন যে, বিএনপি শান্তিতে বিশ্বাসী এবং কেবল সমালোচনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি চলমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করে দেন। বিগত ১৬ বছরের নির্বাচনি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ দীর্ঘদিন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, কিন্তু এবার সেই সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ যাতে কোনো অশুভ মহল নস্যাৎ করতে না পারে, সেজন্য তিনি দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকার এবং সজাগ থাকার নির্দেশ দেন। পুরো উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের জয়ী করে একটি সত্যিকারের জনবান্ধব সরকার গঠনের ডাক দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরেই তারেক রহমান রাজশাহীতে পা রাখেন এবং সেখান থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে যান। তাঁর এই আগমনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী শহরসহ নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও লাখো নেতা-কর্মী সকাল থেকেই সমাবেশস্থলে সমবেত হতে থাকেন। ব্যানার, ফেস্টুন আর ধানের শীষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মহানগরী। ২০০৪ সালের পর এটিই রাজশাহীতে তাঁর প্রথম সফর হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আবেগঘন পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশ শেষ করার আগে তিনি আবারও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দেশের আইন অনুযায়ী যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সবাইকে অবিচল থাকার আহ্বান জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top