দীর্ঘ দিনের সীমানা বিরোধের অবসান: সন্দ্বীপের মানচিত্রে যুক্ত হলো ভাসানচর

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ এবং নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও সীমানা সংক্রান্ত বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভাসানচরের ছয়টি মৌজা মূলত সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলমান ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি যৌক্তিক সমাধান হলো। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই দ্বীপটিকে নোয়াখালীর হাতিয়ার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যা সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় কর্তৃক গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটির নিবিড় পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসে যে, ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির মালিকানা সন্দ্বীপের।

এই বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটি কেবল দাপ্তরিক নথির ওপর নির্ভর না করে সরেজমিন পরিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিলের মূল্যায়ন এবং অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজ বা ভূ-উপগ্রহের ছবির সহায়তা নিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৯২ সালের দিকে সন্দ্বীপের ‘ন্যায়ামস্তি’ ইউনিয়নটি নদী ভাঙনের ফলে সম্পূর্ণ সাগরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এর কিছুকাল পরেই সেই একই স্থানে নতুন ভূমি বা চর জাগতে শুরু করে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিতি পায়। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকেই সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছে এই ভূমিটি দৃশ্যমান হতে থাকে। সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দাবি ছিল, এটি তাদের পৈতৃক ভিটা ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নেরই পুনর্জাগরণ। বর্তমানের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি সেই ঐতিহাসিক দাবিকেই জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করল।

বিগত কয়েক বছরে এই দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে দুই জেলার মানুষের মধ্যে নানা কর্মসূচি ও উত্তেজনা দেখা গেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে যখন ভাসানচর থানা গঠনের প্রজ্ঞাপনে এটিকে নোয়াখালীর অংশ বলা হয়েছিল, তখন সন্দ্বীপের ছাত্র ও পেশাজীবী সমাজ রাজপথে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী বিভাগ উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে একটি ১৮ সদস্যের শক্তিশালী কমিটি গঠন করে, যেখানে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় সিএস ও আরএস জরিপসহ সকল দালিলিক প্রমাণ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ন্যায়ামস্তির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বাসিন্দা দিপু সওদাগরের মতো হাজারো মানুষ, যারা এক সময় নিজেদের বসতভিটা হারিয়েছিলেন, আজ তারা নিজেদের আদি ভিটার ওপর অধিকার ফিরে পাওয়ায় বাঁধভাঙা আনন্দ প্রকাশ করছেন। সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমাও এই সিদ্ধান্তে সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top