ইসির ‘নির্লিপ্ততা’ ও ব্যালট কারচুপি নিয়ে বিএনপির কঠোর হুঁশিয়ারি

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রহস্যজনক ‘নীরবতা’ এবং নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। বুধবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় গুলশানে দলের নির্বাচনি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন যে, কমিশন নির্দিষ্ট কিছু দল ও প্রার্থীর ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখালেও প্রভাবশালী পক্ষগুলোর বেলাতে একেবারেই নির্লিপ্ত ও নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপি শুরু থেকেই অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছে, এমনকি নির্বাচনি পরিবেশ অটুট রাখতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পূর্বনির্ধারিত উত্তরবঙ্গ সফর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। অথচ কমিশন এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন উদাসীনতা ও অসম আচরণ নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শন করে দেখান যে, দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানরা খোদ কমিশনের চোখের সামনে জনসভা ও মিছিল করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিপরীতে, বিএনপির প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও নগণ্য কারণেও শোকজ নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, কোনো প্রার্থীর নির্বাচনি এলাকার বাইরের একটি ঘরোয়া দোয়া মাহফিলে আগত অতিথিদের বক্তব্য কিংবা প্রার্থীর মেয়ের ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টের জন্য যদি শোকজ করা হয়, তবে অন্য প্রভাবশালী নেতাদের প্রকাশ্য প্রচারণায় কেন ইসি ব্যবস্থা নিচ্ছে না? এই দ্বিমুখী নীতি জনমনে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারে বিএনপির দীর্ঘদিনের লড়াই ও ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে, তাই তারা কোনোভাবেই একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখতে চান না।

নির্বাচনের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় ‘পোস্টাল ব্যালট’ নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য ও আপত্তি তুলে ধরেছেন এই প্রবীণ নেতা। তিনি অভিযোগ করেন যে, পোস্টাল ব্যালটের নকশায় ধানের শীষের অবস্থান উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাঝামাঝি বা ব্যালটের ভাঁজের নিচে রাখা হয়েছে, যাতে ভোটারদের চোখ সহজেই এড়িয়ে যায়। বিষয়টি কোনো সাধারণ ভুল নয় বরং একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে বিএনপি মনে করে। এর পাশাপাশি বিদেশে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে বাহরাইন ও ওমান থেকে আসা দুটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাহরাইনের একটি বাসা এবং ওমানের একটি গ্যারেজে বিপুল সংখ্যক ব্যালট পেপার নিয়ে কাজ করার দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটের আমানত এভাবে অন্যদের হাতে চলে যাওয়া কেবল অনৈতিকই নয়, বরং দণ্ডনীয় অপরাধ। জামায়াত কর্মীদের এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে তিনি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান ভোটারদের এনআইডি কার্ড এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহের মতো অনৈতিক অপতৎপরতার বিরুদ্ধেও কমিশনকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি পোস্টাল ব্যালট নিয়ে এই ধরণের কারসাজি বন্ধ না হয় এবং ইসি যদি দ্রুত অপরাধীদের এনআইডি ব্লক করাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরুতেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার স্বার্থে এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ সংসদ গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে এবং কমিশনকে তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণের শেষ সুযোগটি কাজে লাগানোর তাগিদ দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা সম্মিলিতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ভোট গ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top