সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ছায়া: বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে অশ্রুসিক্ত ডিজিটাল দুনিয়া

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক কান্ডারি বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়ের সংবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এক বিশাল শোকের ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাঁর মহাপ্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শোকের আবহ তৈরি হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থক তাঁদের প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করে কালো করে দিয়েছেন, যা এই মহীয়সী নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোকের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের আবেগঘন মন্তব্য ও স্মৃতিচারণায় ফুটে উঠছে এক আপসহীন নেত্রীর বর্ণাঢ্য অথচ জীবনভর সংগ্রামের গল্প।

লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন তাঁর মায়ের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন, তখন মুহূর্তেই তা বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ‘আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন’—এমন একটি আবেগী বার্তার নিচে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় জমা হয় তিন লাখেরও বেশি মন্তব্য, যেখানে অগুনতি মানুষ তাঁদের প্রিয় নেত্রীর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। বিএনপির মিডিয়া সেল এই প্রয়াণকে ‘মহাকালের সমাপ্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেকেই খালেদা জিয়াকে বর্তমান সময়ের ‘সুলতানা রাজিয়া’ কিংবা ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শীর্ষ ব্যারিকেড’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁর অটল ধৈর্য, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং শত প্রতিকূলতার মুখেও দেশ না ছাড়ার সিদ্ধান্তটি আজ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

ফেসবুকে সাধারণ মানুষের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে বেগম জিয়ার মার্জিত ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের অনন্য সব দৃষ্টান্ত। কেউ স্মরণ করছেন ১৯৮৭ সালের রাজপথের সেই সাহসী নেত্রীকে, আবার কেউ তুলে ধরছেন ১৯৯১ সালে সরাসরি তাঁকে দেখার মুগ্ধতার গল্প। বিশেষ করে তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি—‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু’—হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। সমালোচকরাও আজ তাঁর ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থানের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করছেন না। জেনেশুনে কারাগারের নির্জনতাকে বেছে নেওয়া এবং জনগণের দুঃখের ভাগীদার হওয়াকে অনেকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় নৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।

পুত্রের অনাথ হওয়ার বেদনা থেকে শুরু করে এক রাজনীতিকের চিরতরে সংসদ থেকে হারিয়ে যাওয়ার শূন্যতা—সব মিলিয়ে ফেসবুক আজ এক গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন। মানুষের ভালোবাসায় অভিষিক্ত এই ‘রানি’ হয়তো কোনো রত্নখচিত মুকুট পরেননি, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান যে কতটা গভীরে, তা আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি পাতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। কেউ বলছেন, তিনি স্বৈরাচারকে ‘না’ বলার প্রতীক ছিলেন; আবার কেউ বলছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ছিলেন এক অবিনাশী প্রদীপ। এই শোক কেবল একটি দলের নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ ও শক্তিশালী অধ্যায়ের সমাপ্তিতে গোটা জাতির আবেগ আজ ডিজিটাল পর্দায় অশ্রু হয়ে ঝরছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top