বাংলাদেশের রাজনীতির এক নক্ষত্রের প্রয়াণ, বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্মের অবসান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন শীর্ষ নেতার প্রস্থান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘ সংগ্রামের এক বর্ণাঢ্য মহাকাব্যের অবসান।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করা বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে অত্যন্ত সাধারণ ও পারিবারিক আবহে। মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে একজন গৃহিণী হিসেবেই তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের অকাল ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সময়ের প্রয়োজনে তিনি রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হন। অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং একজন গৃহিণী থেকে নিজেকে দক্ষ ও আপসহীন এক রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অদম্য ভূমিকা তাঁকে জনগণের হৃদয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে ঠাঁই করে দেয়।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এক অনন্য বিশ্ব রেকর্ড গড়েন, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে ছিল এক বিরল নজির। তিনি মোট তিন মেয়াদে (১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রভূত সাফল্য অর্জিত হয়। বিশেষ করে মেয়েদের উপবৃত্তি ও প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো তাঁর আমলেই শুরু হয়েছিল, যা দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

তবে এই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন কখনোই মসৃণ ছিল না। প্রতিহিংসার রাজনীতি আর আইনি লড়াইয়ের এক দীর্ঘ চড়াই-উতরাই তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে। বছরের পর বছর কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব আর গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর আদর্শ ও নীতি থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর লক্ষ লক্ষ সমর্থকের কাছে সাহসের প্রতীক হিসেবেই টিকে ছিলেন। আজ তাঁর মৃত্যুতে জাতি একজন দূরদর্শী অভিভাবককে হারালো, যাঁর অভাব অপূরণীয়। বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ, নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষের মনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। দলমত নির্বিশেষে দেশের সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top