জামায়াত এমপি মো. মিজানুর রহমান এমপি হোস্টেলে ওয়াশিং মেশিন
 

 

এমপির ফ্ল্যাটে পর্দা-ওভেন চেয়ে সমালোচনার মুখে জামায়াত, ‘নির্বাচনী ট্রিকস’ বলছে বিএনপি-ইসলামী আন্দোলন

“আমরা ক্ষমতায় গেলে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি নেব না, প্রয়োজনে রিকশায় চড়ব। সরকারি প্লট কিংবা ফ্ল্যাটও নেব না”—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এমন ত্যাগী ও বৈরাগ্যপূর্ণ ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তবে নির্বাচনের পর দলটির সংসদ সদস্যদের ভিন্ন রূপ দেখে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। খোদ সংসদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য মো. মিজানুর রহমান এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটের জন্য ‘জানালার পর্দা, ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন’ চেয়ে জোর দাবি জানিয়েছেন।

সংসদের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে জনস্বার্থ বাদ দিয়ে জামায়াত এমপির এমন ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ঝড় উঠেছে।

সংসদে ঠিক কী বলেছিলেন জামায়াত এমপি?

বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন জামায়াত এমপি মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন:

“মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সংসদ সদস্যরা অনেক টাকার সম্পূরক বাজেটও পাস করেছেন। কিন্তু এই সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোয় থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার দরজা–জানালার পর্দাটি এখন পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম যে আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোয় একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”

বুকের ওপর কত বড় পাথর চাপা দিতে হয়েছিল: আন্দালিব রহমান পার্থ

জামায়াত এমপির এমন দাবির পর সংসদে দাঁড়িয়েই এর কড়া ও রসবোধপূর্ণ সমালোচনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। জামায়াতের নীতি ও আদর্শের বৈপরীত্য নিয়ে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন:

“যেখানে বাইরে ওনাদের দল থেকে বড় বড় কথা বলা হয় যে আমরা গাড়ি নেব না, প্লট নেব না—আজ ওনার বক্তব্য শুনে আমার কাছে মনে হচ্ছে, গাড়ি আর প্লট যখন তারা বাদ দিলো, তখন ওনাদের বুকের ওপরে কত বড় পাথর চাপা দিয়ে তা বাদ দিতে হয়েছিল! যার কারণে আজ সামান্য মাইক্রোওয়েভ আর ওয়াশিং মেশিনের জন্য এই সর্বোচ্চ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ওনাকে কথা বলতে হচ্ছে। আমার মনে হয়, সংসদের এই স্ট্যান্ডার্ড এবং স্ট্রাকচার আমাদের সবার মেইনটেইন করা উচিত।”

ব্যক্তিগত সুবিধা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস এক নয়: জামায়াত

বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলেও এর মধ্যে দোষের কিছু দেখছে না জামায়াত। দলের এই অবস্থানকে ডিফেন্ড করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট না নেওয়ার ঘোষণাটি ছিল সংসদ সদস্যদের স্থায়ী ‘ব্যক্তিগত সুবিধা’ ত্যাগের অংশ। জামায়াতের এমপিরা এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড় আছেন।”

তিনি আরও বলেন, “সংসদ সদস্যদের জন্য নির্মিত হোস্টেলে বা ফ্ল্যাটে থাকতে হলে চেয়ার-টেবিল, লাইটের পাশাপাশি পর্দা, ওভেন বা ওয়াশিং মেশিনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রয়োজন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এটা তো আর এমপিরা নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন না, চাকুরিকালীন ব্যবহার করবেন। একদল লোক জামায়াতকে দেখতে পারে না বলেই ‘চলন বাঁকা’ নীতির অংশ হিসেবে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

ভোট পাওয়ার ট্রিকস ও জনগণের সাথে প্রতারণা: বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ

জামায়াত নেতার এই সাফাইকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ ও ‘জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।

  • মাওলানা গাজী আতাউর রহমান (যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ): “এগুলো অত্যন্ত নিচু মানসিকতার পরিচয় ও লজ্জার বিষয়। একজন সংসদ সদস্য জনগণের কোটি কোটি টাকার সংকটের কথা না বলে সংসদে দাঁড়িয়ে রান্নার চুলা আর ওভেন চাচ্ছেন! জামায়াত আমির নির্বাচনের আগে বলেছিলেন সরকারি সুবিধা নেবেন না, অথচ এখন বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার পর তিনি নিজে সব রকমের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। নির্বাচনের আগে ভোট পেতে তারা এক কথা বলে, আর জেতার পর উল্টো রূপ দেখায়।”

  • হাবিবুন নবী খান সোহেল (যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি): “জামায়াত আমিরের প্লট-গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণা ছিল কেবলই নির্বাচনে বৈতরণী পার হওয়ার একটা সস্তা ‘পলিটিক্যাল ট্রিকস’। জামায়াত একটি চরম সুবিধাবাদী দল। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা ১৯৭১ সালেও পাকিস্তানিদের সঙ্গে আঁতাত করেছিল, আর এখন ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর পথ খুঁজছে। এদের কথা ও কাজের কোনো মিল নেই।”

  • সাইফুল হক (সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি): “দেশের ৩-৪ কোটি মানুষ যেখানে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, সেখানে সংসদে দাঁড়িয়ে এমপিদের ওয়াশিং মেশিন ও ওভেন খোঁজা একেবারেই অনৈতিক ও অযৌক্তিক। সংসদ সদস্য পদটিকে একটি অলাভজনক সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার, কিন্তু অনেকে একে অর্থবিত্ত ও আয়েশ বাড়ানোর মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছেন।”

প্রতি মিনিটে খরচ পৌনে ৩ লাখ টাকা, সেখানে পর্দা-ওভেনের গল্প!

সংসদের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি রিপোর্টের তথ্য টেনে তিনি বলেন, ১১তম সংসদের হিসাব অনুযায়ী সংসদের কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে এই ব্যয়ের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “প্রতি মিনিটে যেখানে রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা বা দেশের আইন প্রণয়নের কথা বাদ দিয়ে জামায়াত এমপিরা নিজেদের ফ্ল্যাটের পর্দা আর ওভেন নিয়ে গালগল্প করছেন। এরা বিরোধী দল হিসেবে কতটা দায়িত্বহীন, তা দেশের জনগণ এই এক ঘটনাতেই বুঝে গেছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top