সব দোষ ঘুরেফিরে রাজনীতিবিদের- সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন
 

 

সব দোষ ঘুরেফিরে রাজনীতিবিদের, কারণ ফাইলের শেষ সইটা তাদের করতে হয়: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

“দুর্নীতি সব জায়গায় ও সব পেশায় কমবেশি হয়। কিন্তু ঘুরেফিরে সব দোষ এসে পড়ে রাজনীতিবিদদের ওপর। কারণ টেবিলে যতগুলো ফাইলই তৈরি হোক না কেন, সবশেষে সইটা করতে হয় একজন রাজনীতিবিদকেই। এ জন্য সমস্ত দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপে।”—সংসদে দাঁড়িয়ে আমলা ও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে এভাবেই নিজের অকপট ও বাস্তবসম্মত মন্তব্য প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অতিরিক্ত মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই আজ সংসদে দুদকের এই অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবিটি উত্থাপন করেন।

দুদক পুনর্গঠনে সার্চ কমিটি হচ্ছে, প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি মনোনীত

গত ৩ মার্চ থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে শীর্ষ পদ শূন্য থাকা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠনে বড় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে খুব শিগগিরই ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করা হচ্ছে।

সার্চ কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন:

“আপনারা হয়তো মনে করে নিয়েছেন যে সরকার দুর্নীতি দমনে আন্তরিক না। কিন্তু সরকার প্রথম থেকেই আন্তরিক ছিল। সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমরা যথাসময়ে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাইনি। বহু দিন গড়িয়ে যাওয়ার পর, দয়া করে গতকাল রোববার (১৪ জুন) মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাঁর প্রতিনিধি মনোনীত করে ফাইলে সই করে দিয়েছেন। এখন দ্রুতই সার্চ কমিটি ও নতুন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হবে এবং দুর্নীতির সমস্ত বিষয় জোরালোভাবে অ্যাড্রেস করা হবে।”

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদককে শক্তিশালী করতে যে সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তা সংসদ অনুমোদন না করায় পূর্বের মূল আইনটিই পুনর্বহাল হয়েছে। বর্তমান সার্চ কমিটি গঠন এবং নতুন কমিশন নিয়োগ হবে একটি ‘মধ্যবর্তী ব্যবস্থা’। পরবর্তীতে সংসদে নতুন ও আধুনিক ‘দুর্নীতি দমন কমিশন বিল’ পাস করে এই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্থায় রূপান্তর করা হবে, যা নিয়ে ইতিমধ্যে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দুর্নীতিতে এক নম্বরে রাজনীতিবিদ, দুই নম্বরে আমলা: রুমিন ফারহানা

এর আগে ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বর্তমান ও সাবেক সরকারের দুর্নীতি বিরোধী সদিচ্ছা নিয়ে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আমি গুগলে সার্চ দিয়ে দেখেছি, বাংলাদেশে দুর্নীতিতে ‘টপ মোস্ট’ পেশা দুটি কী কী। ফলাফলে এক নম্বরে এসেছে রাজনীতিবিদদের নাম এবং দুই নম্বরে আছে আমলাদের নাম। রাজনীতি করলে যে বিপুল পয়সা উৎপাদন করা যায়, তা সম্ভবত বাংলাদেশের মতো দেশেই সম্ভব।”

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বালিশ কেলেঙ্কারি এবং ব্যাংক লুটের খতিয়ান তুলে ধরে রুমিন ফারহানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

“আমাদের আশা ছিল, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন ‘নতুন বাংলাদেশ’ নিয়ে কথা হচ্ছে, তখন আমরা দুদককে নখদন্তহীন বাঘের খোলস থেকে বের করে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারব। অন্তর্বর্তী সরকার এ লক্ষ্যে অধ্যাদেশও দিয়েছিল। এই নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০০-র বেশি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করলেও দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন আইনটি করা হয়নি। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, একটার পর একটা ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার যেমন দুদককে শক্তিশালী করতে চায়নি, একইভাবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান সরকারও দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নয়।”

পছন্দের লোক ও আদর্শ দেখে নিয়োগ হয়: শফিকুল ইসলাম মাসুদ

আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ দুদকের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, “দুদকে আসলে স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকে না। সবসময়ই ক্ষমতাসীনদের পছন্দের লোক এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে সামনে রেখে সেখানে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এই কমিশনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জনগণের সামনে দৃশ্যমান হয় না।”

তীব্র বাদানুবাদ ও সমালোচনার মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের সব খাতে দুর্নীতি দমনে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং নতুন স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top