দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ইমিগ্রেশনে বাধা
 

 

দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ইমিগ্রেশনে বাধা: সংসদে এমপিদের তীব্র ক্ষোভ, ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার তলব

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে কালো তালিকায় (ব্ল্যাকলিস্ট) নাম থাকার অজুহাতে আটকে দিয়েছে দেশটির অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল থাকার পরও স্বাধীন বাংলাদেশের একজন শীর্ষ সরকারি উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে এভাবে হেনস্তা ও বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে (ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার) তলব করেছে বাংলাদেশ সরকার।

এদিকে, এই অপমানজনক ঘটনা এবং ভারত সীমান্তে ক্রমাগত হত্যাকাণ্ড ও পুশ-ইনের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু নিয়ে আজ জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে বিমানবন্দরে ‘রেড ফ্ল্যাগ’

ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম হিন্দোস্তান টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে রোববার (১৪ জুন) সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। কিন্তু বিমানবন্দরে সাধারণ নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় দেশটির ইমিগ্রেশন ডাটাবেজে তাঁর নামের পাশে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সতর্কতা সংকেত দেখায় এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে আটকে দেন।

ইউটিউব চ্যানেল ‘জাহেদ’স টেক’ ও কালো তালিকায় নাম থাকার কারণ

হিন্দোস্তান টাইমস দাবি করেছে, ডা. জাহেদ উর রহমানের অতীতে ভারত-বিরোধী ও ভারতের বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ের তীব্র সমালোচনামূলক বক্তব্য দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর নিজস্ব জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল “জাহেদ’স টেক”-এ দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কারণে ভারতে তাঁর চ্যানেলটি আগে থেকেই ব্লক বা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আর এই কারণেই তাঁর নাম ভারতের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নজরদারির তালিকায় (ব্ল্যাকলিস্ট) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দিল্লির একজন কর্মকর্তা বলেন, “ভারতের বিষয়ে তাঁর অতীতের বিভিন্ন সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকে রেখেছিল। পরে অবশ্য উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সাপেক্ষে তাঁকে ভারতে প্রবেশের জন্য এককালীন বিশেষ অনুমতি ও ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে আত্মসম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে তিনি নিজেই অন্য একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।”

ভারতীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ডা. জাহেদ উর রহমান কূটনৈতিক পাসপোর্ট নয়, বরং সাধারণ পাসপোর্টে সার্ক (SAARC) ভিসা নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন এবং বিষয়টি দিল্লিকে আগে থেকে অফিশিয়ালি জানানো হয়নি। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ, ৩০০ বিধিতে মন্ত্রীর বিবৃতি দাবি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে ভারতের বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা এবং দেশে ফিরে আসতে বাধ্য করার এই অপমানজনক ঘটনাটি আজ সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও বড় ধরনের ঝড় তোলে।

পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর হিসেবে অভিহিত করে মহান সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন:

“যথাযথ কূটনৈতিক চিঠি দেওয়ার পরেও কেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে ভারতের বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভারতে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি চরম অপমানে সেখান থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে আমাদের কূটনৈতিক কোনো ব্যর্থতা কাজ করেছে কি না এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা দেশবাসীকে জানাতে হবে।”

এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় মর্যাদার বিষয়ে সংসদে ৩০০ বিধিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দাবি করেন এই সংসদ সদস্য। অবশ্য স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম তাঁর এই বক্তব্যকে পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে গ্রহণ না করে বলেন, এটি পয়েন্ট অব অর্ডার না হলেও সদস্য চাইলে এ বিষয়ে পরে একটি নোটিশ দিতে পারেন এবং তখন বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন নিয়ে আলোচনা স্থগিতের প্রতিবাদ

এর আগে, ভারত সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক ক্রমাগত সীমান্ত হত্যাকাণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক পুশ-ইনের মতো জাতীয় ইস্যু নিয়ে সংসদে নির্ধারিত বিশেষ আলোচনা রহস্যজনকভাবে স্থগিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (ঢাকা-১৪) মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।

পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ আরমান প্রশ্ন তোলেন, “গতকালও সীমান্তে আমাদের এক যুবকের লাশ মনু নদীর চরে পড়ে ছিল। জনগণের রক্তের চেয়ে আর কী গুরুত্ব থাকতে পারে যে এত বড় একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ‘অনিবার্য কারণবশত’ স্থগিত করতে হলো? কোন অদৃশ্য ইশারায় এটি বাদ গেল?”

জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং বাজেট অধিবেশনের ব্যস্ততার কারণে এটি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ উল্লেখ করে আশ্বস্ত করেন যে, দ্রুতই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে এর ওপর বিশদ আলোচনা হবে।

ঢাকার কড়া প্রতিবাদ ও ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধে-কে তলব

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক ঘটনার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধে-কে জরুরি ভিত্তিতে তলব করে এই ঘটনার প্রতি গভীর হতাশা ও কড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই ঘটনাকে “অনভিপ্রেত” এবং “দুর্ভাগ্যজনক” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকার এ বিষয়ে কূটনৈতিক স্তরে অত্যন্ত কঠোর ও যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন ওই আন্তর্জাতিক বৈঠকে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার বিষয়টি গত শুক্রবারই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানিয়েছিল। কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দিয়ে চরম কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে।

কলম্বো হয়ে সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরলেন উপদেষ্টা

রোববার রাতে দিল্লি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সরাসরি কোনো flight না থাকায়, ভারতের দেওয়া বিলম্বিত বিশেষ অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ট্রানজিট নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ডা. জাহেদ উর রহমান। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আজ সোমবার দুপুরে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন ভারত ও বাংলাদেশ—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন করে জোড়া লাগানোর জোর চেষ্টা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার এই চেষ্তার মধ্যেই নতুন করে এই ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের অস্বস্তি ও মেঘের সৃষ্টি করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top