পদ্মার নীল জলে তলিয়ে গেলো ঈদের আনন্দ: দৌলতদিয়ায় পল্টুন থেকে বাস নদীতে পড়ে ২ নারীর মৃত্যু, ৪০ জন পানির নিচে

ঈদের আনন্দটুকু বিষাদে রূপ নিতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে সেই সব হাসি-মুখ, যারা প্রিয়জনদের সাথে ঈদ কাটিয়ে সোনালি স্বপ্ন নিয়ে ফিরছিলেন যান্ত্রিক শহরে। মুহূর্তের অসতর্কতায় পদ্মা কেড়ে নিল দুটি প্রাণ, আর অনেক পরিবারে নামিয়ে আনলো সারাজীবনের অন্ধকার।

বাড়িতে মায়ের হাতের রান্না, ভাই-বোনের সাথে আড্ডা আর শেকড়ের টানে কাটানো কটা দিন শেষে বুকভরা স্মৃতি নিয়ে বাসে উঠেছিলেন তারা। গন্তব্য ছিল তিলোত্তমা ঢাকা। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ যখন দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটের ঢালু পথ দিয়ে পন্টুনে উঠছিল, তখনো কেউ জানত না—মৃত্যু তাদের ঠিক কত কাছে।

বিকেল সাড়ে ৪টা। ঘাটের পন্টুনে বাসটি ফেরিতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে ১০-১২ জন যাত্রী ভাগ্যক্রমে নেমে যান। কিন্তু বাসের ভেতরে রয়ে যান বাকিরা। হঠাৎ চালক নিয়ন্ত্রণ হারালেন। আর্তচিৎকার করার সুযোগটুকুও পেলেন না ভেতরে থাকা মানুষগুলো। চোখের পলকে বিশাল বাসটি ঢালু পথ বেয়ে আছড়ে পড়ল পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে। মুহূর্তেই নীল জল গিলে নিল আস্ত একখানা বাস।

হারিয়ে গেলেন রেহেনা ও মর্জিনা:

আশপাশের মানুষ আর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন উদ্ধার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন পদ্মার বুক থেকে নিথর দেহে উঠে আসেন ৬০ বছর বয়সী রেহেনা বেগম এবং ৫৫ বছর বয়সী মর্জিনা বেগম। যে চোখগুলো একটু আগে ঢাকার পথের পরিচিত দৃশ্য দেখছিল, সেই চোখগুলো চিরতরে বুজে গেছে। ঈদের নতুন কাপড় বা ব্যাগে থাকা বাড়ির উপহারগুলো এখন লোনা জলে ভিজে একাকার।

এক নারী চিকিৎসকের লড়াই:

বাসের ভেতর থেকে ২৯ বছর বয়সী নুসরাত নামের এক নারী চিকিৎসককে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছেন। হয়তো তার চোখের সামনে এখনো ভাসছে সেই মুহূর্তটি, যখন বাসের জানলা দিয়ে আসা পদ্মার পানি সব অন্ধকার করে দিচ্ছিল।

ঘাটে স্বজনদের হাহাকার:

সন্ধ্যার আবছায়া যখন দৌলতদিয়া ঘাটকে ঢেকে দিচ্ছিল, তখন উদ্ধার হওয়া লাশের পাশে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছিল বাতাস। যারা কর্মস্থলে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, তারা এখন ফিরছেন সাদা কাফনে মোড়ানো লাশ হয়ে। ঈদের আনন্দটুকু এভাবেই বিষাদের চাদরে ঢেকে দিল প্রমত্তা পদ্মা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top