ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এক যুগান্তকারী ভাষণ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে অধিবেশন শুরুর পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি সংসদকে দেশের সকল যুক্তি, তর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি জবাবদিহিমূলক সংসদের এই যাত্রাকে তিনি ‘গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয়’ হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের মূল বিষয়বস্তু ও বিশেষ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ঐতিহাসিক পটভূমি ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত যারা গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বিশেষভাবে ‘আয়নাঘর’-এর মতো বর্বর বন্দিশালায় নির্যাতিত এবং গুম-খুন ও মিথ্যা মামলার শিকার অগণিত মানুষের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন।
খালেদা জিয়ার অবদান ও আপসহীন নেতৃত্ব
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম। তারেক রহমান বলেন, “দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন এবং স্বৈরাচারের সাথে কোনোদিন আপস করেননি।” তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, খালেদা জিয়া আজ দেশ ও জনগণের এই সাফল্যের মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে একজন স্মরণীয় ও অনুকরণীয় রাজনীতিবিদ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও ফ্যামিলি কার্ডের রাজনীতি
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো দেশের এবং সকল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করা’ এবং একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সদস্যদের দেশ গড়ার এই যাত্রায় সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
সংসদীয় রীতিনীতি ও নজিরবিহীন পরিস্থিতি
অধিবেশনের শুরুতে সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জনরোষে তারা আজ পলাতক, নিখোঁজ অথবা কারাগারে। এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করে তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে অধিবেশন পরিচালনার জন্য নাম প্রস্তাব করেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে সংসদ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ঐতিহাসিক নজিরটি স্মরণ করিয়ে দেন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ভাষণ থেকে স্পষ্ট যে, নতুন সরকার প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সংসদ-কেন্দ্রিক রাজনীতি করতে আগ্রহী। বিশেষ করে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতিত্ব করার প্রস্তাব দেওয়া এবং ১৯৭৩ সালের নজির টানা—তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রচেষ্টাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।







