ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে গভীর আবেগ এবং বিনম্র শ্রদ্ধায় রাজধানীসহ সারাদেশে পালিত হয়েছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের প্রথম প্রহর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে মানুষের ঢল নামে, যা অব্যাহত ছিল পরের দিন দুপুর পর্যন্ত। একুশের চিরচেনা গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গেয়ে খালি পায়ে ফুল হাতে সারিবদ্ধভাবে সর্বস্তরের মানুষ ভাষা শহীদদের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করেন। এবার একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মধ্যে ছিল এক ভিন্ন আমেজ, যেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার জোরালো প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।
শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবসটির সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তার পরপরই রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতার পর প্রথমবারের মতো সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় জোট শ্রদ্ধা নিবেদন করে, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এরপর একে একে প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কূটনীতিকরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভোরের আলো ফুটতেই প্রভাতফেরি নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।
শুধুমাত্র বাঙালির জন্য নয়, একুশ এখন বিশ্বজনীন। এবার শহীদ মিনারে বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও কূটনীতিকরা বাঙালির ভাষার প্রতি এই গভীর মমত্ববোধ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও তাদের নিজস্ব ভাষার অধিকার রক্ষায় একুশকে প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া বাংলা একাডেমি, ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দিবসটিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। বক্তারা তাদের বক্তব্যে একুশের চেতনাকে কেবল স্মৃতির পাতায় নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করে দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার সংকল্প ব্যক্ত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ
-
রাজনৈতিক মেলবন্ধন: প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জামায়াতের আমিরের জোটগত শ্রদ্ধা নিবেদন সংসদীয় ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
-
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: দুর্নীতি দমন এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার রক্ষার দাবি এবারের একুশে বিশেষভাবে জোরালো ছিল।
-
সাংস্কৃতিক জাগরণ: বাংলা একাডেমি ও ছায়ানটের অনুষ্ঠানে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।







