বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার। তবে শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে ‘১৮০ দিন’ মেয়াদের একটি বিশেষ সময়সীমা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার শপথের দিন বিএনপি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বিদ্যমান সংবিধান লঙ্ঘন করে এমন কোনো সমান্তরাল শপথ নেওয়া সম্ভব নয়। এর ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে ‘উদ্ভট’ প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছিল, তা হোঁচট খেয়েছে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার তাদের প্রথম কার্যদিবসেই পুনরায় ‘১৮০ দিন’ শব্দটি সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই ১৮০ দিনের সাথে জুলাই সনদের সংস্কার প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত সরকারের প্রশাসনিক ও জনসেবামূলক অগ্রাধিকারের একটি রোডম্যাপ। বুধবার সচিবালয়ে প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, প্রধানমন্ত্রী সরকারের প্রথম ১০০ দিনের প্রথাগত পরিকল্পনার পরিবর্তে ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার তালিকা নির্ধারণ করেছেন। এই তালিকায় সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার ওপর।
সরকারের এই অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মনে করছেন, বিএনপি শুরু থেকেই জুলাই সনদের অবাস্তব প্রক্রিয়া নিয়ে নীরব থাকলেও মনেপ্রাণে তা গ্রহণ করেনি। সাংবাদিক মাসুদ কামালের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছিল তা ছিল জটিল ও অসাংবিধানিক। বিএনপি এখন তাদের নিজস্ব ‘৩১ দফা’ এবং জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট পাওয়া নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে চায়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও স্পষ্ট করেছেন যে, সংসদকে অবশ্যই বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী চলতে হবে।
অন্যদিকে, রমজান মাসকে সামনে রেখে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানিয়েছেন, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হাতের নাগালে রাখা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। শিগগিরই সরকার এই ১৮০ দিনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ জনগণের সামনে উপস্থাপন করবে। তবে এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে, যা আইনি অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সব মিলিয়ে জুলাই সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়েছে।







