জনগণকে আস্থায় আনাই ছিল আমাদের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’: দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা দিলেন তারেক রহমান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর প্রথমবারের মতো দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি নির্বাচনে জয়ের নেপথ্যের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। নির্বাচনের আগে থেকেই এই পথচলা কঠিন হবে বলে যে আভাস তিনি দিয়েছিলেন, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে জয়ের কৌশল বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে জবাব দেন। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন যে, জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং তাঁদের নিজেদের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করতে পারাটাই ছিল তাঁদের একমাত্র ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’, যেখানে তাঁরা আল্লাহর রহমতে সফল হয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জনে কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করে জনগণকে আস্থায় নেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে ভারত, চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যের সাংবাদিকরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভারতীয় এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। একইভাবে চীন ও পাকিস্তানের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক পুনর্গঠনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং চীনের সাথে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব বজায় থাকলেও যেকোনো প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এ দেশের অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব বিবেচনা করে। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো কৌশলগত বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উপযোগিতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানান।

বিগত সরকারের পতন ও পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের কৌতূহলের জবাবে তারেক রহমান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেখ হাসিনার বিচার কিংবা ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি জানান, সকল বিষয়ই প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে এবং তাঁর সরকার বিচার বিভাগে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না বরং আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেবে। তিনি দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি চাঙা করতে নতুন বিনিয়োগ আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অলিগার্ক বা বিশেষ গোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির বদলে একটি মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের যোগ্যতাবলে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সমান সুযোগ পাবেন।

তরুণ প্রজন্ম এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন যে, তাঁদের সরকার কেবল তরুণদেরই নয়, বরং নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া প্রতিটি মানুষের কথা শুনবে। দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে, তা দূর করে সুশাসন নিশ্চিত করাকেই তিনি নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, আইন সবার জন্য সমান হবে এবং কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষা না করে সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়নের কাজ করবে বিএনপি সরকার। এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারেক রহমান বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে একটি জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন বাংলাদেশের শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top