গণতন্ত্রের নবযাত্রা: উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ, শুরু হয়েছে গণনা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় যুগের দুঃশাসন অবসানের পর একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটের ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ চলে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই এখন দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ভোট গণনার কার্যক্রম। সারা দেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এবং সাতজনের প্রাণহানির মতো বেদনাদায়ক খবর থাকলেও সার্বিকভাবে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা তাঁদের রায় প্রদান করেছেন। এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব ছিল সংসদীয় ভোটের পাশাপাশি সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষে আয়োজিত গণভোট, যেখানে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে অংশ নিয়েছেন।

নির্বাচনের এই ঐতিহাসিক দিনে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সকালে রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে আজকের দিনটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে এই দিনটিকে মুক্তির দিন ও নতুন স্বপ্নের সূচনালগ্ন হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন তাঁর ভোট প্রদান শেষে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে, বাংলাদেশ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রায়নের ট্রেনে সওয়ার হয়েছে এবং এই ট্রেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবেই। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এবং নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও একটি দখলমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সরকার গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তাঁদের ১১-দলীয় জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে দাবি করেছেন।

উৎসবের আমেজে ভোট চললেও দেশের কয়েকটি স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ভোট চলাকালীন পৃথক ঘটনায় মোট সাতজন ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সরাইলে ভোটার এবং কর্মকর্তাদের আকস্মিক মৃত্যু ও সংঘর্ষের ঘটনা রয়েছে। বিশেষ করে খুলনায় বিএনপি নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও গোপালগঞ্জে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ভোটারদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন নিরাপত্তা সদস্য আহত হন। তবে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৫ কোটিরও বেশি ছিলেন তরুণ ভোটার, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের নির্ধারক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, তবে বিএনপি ও জামায়াতসহ নিবন্ধিত মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল এই মহোৎসবে শামিল হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং এক লাখের বেশি সেনাসদস্যের নিচ্ছিদ্র পাহারায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে। এখন সারা দেশের মানুষের নজর টেলিভিশন পর্দা ও নির্বাচনী ফলাফলের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top