ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঠিক আগের দিন বুধবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইসির অবস্থান পরিষ্কার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ব্রিফিংয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রধানত একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং এর ফলে নির্বাচনের বৈধতা ও জনগ্রহণে কোনো প্রভাব পড়বে কি না—এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলা হয়। এর জবাবে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত দেড় দশক ধরে দেশে যে পরিমাণ গণতান্ত্রিক ঘাটতি ছিল এবং মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল, তার ফলে বর্তমান প্রজন্ম ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এখন একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং যারা গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল, তারা বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। এ কারণেই কিছু রাজনৈতিক সত্তা এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তবে এতে ভোটার উপস্থিতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, কারণ আওয়ামী লীগ সরাসরি না থাকলেও তাদের জোটের শরিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
নির্বাচন কমিশনার আরও জানান যে, এবারের নির্বাচনে ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হবে বলে তারা আশা করছেন। বিশেষ করে যারা ৩০ বছর বয়সের কোঠায় আছেন এবং আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মাধ্যমে ৯০০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে এবারই প্রথম ড্রোন, ইউএভি এবং বডি ক্যামেরার মতো উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনাকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করলেও সার্বিক পরিবেশকে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সেরা হিসেবে দাবি করেছেন তিনি। কোনো কেন্দ্রে বড় ধরনের গোলযোগ হলে প্রয়োজনে সেদিনই বিকল্প উপায়ে ভোট নেওয়ার প্রস্তুতিও কমিশনের রয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সময়সূচি নিয়ে ইসি জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রেই গণনা শুরু হবে। প্রতিটি আসনে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার ভোট এবং দুই ধরনের ব্যালট (সংসদ ও গণভোট) থাকায় প্রাথমিক ফলাফল আসতে গভীর রাত বা ভোর হতে পারে। তবে সব কিছু গুছিয়ে শুক্রবার সকালে সারা দেশ থেকে আসা ফলাফলের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। পূর্বসূরিদের কারাবরণ বা ব্যর্থতা তাকে ভাবাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে, তারা জাতির কাছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকেই কাজ করছেন। আইনের মধ্যে থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন বলে তাঁদের মনে কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা নেই। ইসির এই বিস্তারিত ব্রিফিং মূলত আন্তর্জাতিক মহলের সংশয় দূর করার এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রমাণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।







