ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি যুগান্তকারী ও জনবান্ধব নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। শুক্রবার বিকেলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি এই ইশতেহারের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই ইশতেহারকে বিএনপি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং আগামীর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি ‘সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। দলটির মূল দর্শনে এবার প্রতিশোধের রাজনীতির বদলে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন দেখা গেছে।
ইশতেহারের শুরুতেই গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, পুলিশের আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বিএনপি প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। কৃষকদের জন্য থাকছে ‘কৃষক কার্ড’, যা ভর্তুকি ও সহজ ঋণের মাধ্যমে কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে দলটি আশা করছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অধ্যায়ে বিএনপি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের পথে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের আমূল সংস্কারের মাধ্যমে লুটপাট বন্ধ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ (PayPal) চালু এবং ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব তৈরির প্রতিশ্রুতি তরুণদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তরুণ প্রজন্মের মেধা বিকাশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষানীতি ও ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনাও এই ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিএনপি এক বিশাল কর্মযজ্ঞের ঘোষণা দিয়েছে। দেশপ্রেমিক জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে একটি সবুজ ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এবং ঢাকার যানজট নিরসনে টেকসই নগরায়ণ ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার পরিকল্পনাটি বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
ইশতেহারের শেষভাগে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিএনপি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চায় যেখানে ভয় নয় বরং অধিকারই হবে শাসনের মূল ভিত্তি। দলটির মতে, লুটপাটের বদলে উৎপাদন এবং বৈষম্যের বদলে ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই হবে তাদের আগামীর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।







