বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি আর ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে ভোক্তা ব্যয়ের লাগাম টানা হয়েছে, তখন এক অনন্য স্থিতিশীলতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। ২০২৫ সালের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন সারা দুনিয়া থেকে পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে, ঠিক সেই সময়েও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতি মার্কিনিদের আস্থা কেবল অটুটই থাকেনি, বরং আমদানির পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মার্কিন বাণিজ্য দফতরের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে বৈশ্বিক বাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি আগের বছরের তুলনায় ১.৪৪ শতাংশ কমেছে। অথচ এই মন্দার মেঘ সরিয়ে বাংলাদেশ তার রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এক বিস্ময়কর উচ্চতায়।
ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে বিশ্ববাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৭১.৯০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। আমদানির এই সামগ্রিক চিত্রটি নেতিবাচক হলেও বাংলাদেশের জন্য তা বয়ে এনেছে সুসংবাদ। এই ১১ মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে ১২.৪৩ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্যমান প্রায় ৭.৬০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে চীনের মতো বড় রফতানিকারক দেশের অবস্থান প্রায় ৩৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের এই উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে মার্কিন ক্রেতারা এখন চীনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে করছেন। বিশেষ করে বড় আকারের অর্ডার সামলানোর সক্ষমতা, সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এবং প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে পেরেছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে যা দেশের পোশাক খাতের জন্য আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। যদিও রফতানির পরিমাণ ও আর্থিক মূল্যমান বেড়েছে, কিন্তু প্রতিটি পোশাকের গড় দাম বা ইউনিট প্রাইস কমেছে প্রায় ০.৭৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের আগের চেয়ে কম লাভে বা অনেক ক্ষেত্রে দরকষাকষির চাপে পড়ে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের একক হিসেবে রফতানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বছরের শেষ প্রান্তে এসে অর্ডার প্রবাহে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এটি মূলত প্রতিযোগী দেশ যেমন ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার দ্রুত উত্থান এবং বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তনের একটি ফল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিমাণগত দিক থেকে বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে কেবল সস্তা শ্রম বা বিশাল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন তাদের ইউনিট মূল্য বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, বাংলাদেশকে সেই পথেই হাঁটতে হবে। পোশাক খাতে বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের শৌখিন পোশাক উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা সাজানো এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তাকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসায়িক দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো এবং রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই।







