পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’, জেন-জি’র ক্ষমতায়ন ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন নিয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাটে তারেক রহমানের বিশেষ সাক্ষাৎকার

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণী সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দর্শনের কথা তুলে ধরেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন, যা মূলত একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার পথনকশা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তাঁর সরকার জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি অর্থনীতি-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে। গতানুগতিক কেবল কোনো একটি বিশেষ রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার নীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতসহ বিশ্বের প্রতিটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করাই হবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক রূপরেখার ক্ষেত্রে তারেক রহমান এক অভাবনীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তিনি ২০৩০-এর দশকের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপিকে উন্নীত করে একটি ‘ট্রিলিয়ন ডলার’ অর্থনীতিতে রূপান্তরের রূপকল্প তুলে ধরেছেন। যদিও অনেকে একে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন, তবে তিনি তাঁর পরিকল্পনায় যুক্তি দেখিয়েছেন যে কেবল তৈরি পোশাক বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল না থেকে আইটি সেক্টর, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে যদি আধুনিকায়নের মাধ্যমে শক্তিশালী করা যায়, তবে এই অর্জন অসম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, সঠিক নেতৃত্ব এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের প্রতি তারেক রহমানের বিশেষ নজর রয়েছে। তিনি এই তরুণ প্রজন্মের অদম্য সাহস ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনায় তরুণদের জন্য কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, বরং কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিষয়টিও প্রাধান্য পেয়েছে। তরুণরাই হবে আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি—এমনটাই তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সুশাসনের প্রশ্নে তারেক রহমান অত্যন্ত কঠোর এবং সংস্কারমুখী। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে তিনি ব্যাংক খাতের আমূল সংস্কার এবং পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনি এক বিশাল সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছেন, যার মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং বার্ষিক ৫ কোটি (সাক্ষাৎকার অনুযায়ী ২৫ কোটি পর্যন্ত লক্ষ্য) বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি রয়েছে। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং দেশের কৃষি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে কাজ করবে। পরিশেষে, তিনি তাঁর দলের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা—বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে নিজের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top