নতুন বাংলাদেশের মহাপরিকল্পনা: জামায়াতের ইশতেহারে তারুণ্য ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের বিস্তারিত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় ঘোষিত এই ইশতেহারে দলটি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে বিভেদ নয় বরং মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়ের শাসনই হবে মূল ভিত্তি। ইশতেহারের প্রতিটি ছত্রে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা ফুটে উঠেছে। দলটির এই পরিকল্পনায় মোট ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ৪১টি বিশেষ লক্ষ্য বা ভিশনের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

জামায়াতের এই ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় তরুণদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং তাদের ক্ষমতায়নের ওপর। দলটি মনে করে, আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধাবীদের, যেখানে সরকারি চাকরিতে আবেদনের জন্য কোনো ফি দিতে হবে না এবং নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হবে মেধা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর একটি আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা কৃষি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প পর্যন্ত প্রতিটি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের ব্যাপক সংস্কারের কথা বলেছে জামায়াত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশি-বিদেশি সকল নাগরিকের জন্য বিষমুক্ত ও ভেজালহীন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক সাহসী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি। ইশতেহারে ‘তিন শূন্য ভিশন’—অর্থাৎ পরিবেশগত অবক্ষয়, বর্জ্য এবং বন্যার ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনার মাধ্যমে একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে।

রাজনীতি ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে জামায়াত সমানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির নির্বাচন এবং শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিগত সময়ের গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বিভাজন তুলে দিয়ে সবার জন্য সমান নাগরিক অধিকার এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়াই হবে দলটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সবশেষে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপ ঘটিয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নই জামায়াতের এই নির্বাচনী ইশতেহারের মূল নির্যাস।

অগ্রাধিকার পাবে ২৬ বিষয়

১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।

২ বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।

৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আদেরকে প্রাধান্য দেয়া।

৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।

৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।

৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।

৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।

১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।

১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।

১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।

১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।

১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা।

১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

১৯. আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।

২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।

২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।

২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।

২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top