দীর্ঘ দুই দশকের আইনি লড়াই আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি আদালত বা ইকসিড (ICSID) ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন (৪.২০ কোটি) মার্কিন ডলার প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে রায়ের অংক নিয়ে সরকারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। জ্বালানি সচিবের মতে, বাংলাদেশ প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিশাল দাবি উত্থাপন করলেও আন্তর্জাতিক আদালত শেষ পর্যন্ত ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেছে। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের এই সংকটের মূলে রয়েছে দুই দশক আগের এক প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি। ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নাইকোর হাতে এই গ্যাসক্ষেত্রের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তির মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় নাইকো তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের অনুকূলে বিপুল অংকের অর্থ লেনদেন শুরু করে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির খেসারত দিতে হয় জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। নাইকো খনন কাজ শুরু করার পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং একই বছরের ২৪ জুন পুনরায় দ্বিতীয়বারের মতো মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরপর দুটি বিস্ফোরণে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও জনপদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরিভাবে অযোগ্য এবং অভিজ্ঞতাহীন একটি প্রতিষ্ঠানকে কেবল দুর্নীতির আশ্রয়ে কাজ দেওয়াই ছিল এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রধান কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে নেওয়া ব্যক্তিগত লাভের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির ওপর কতটা দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে মনে করেন, টেংরাটিলার মতো সমৃদ্ধ গ্যাসক্ষেত্রটি যদি সচল থাকত এবং এভাবে নষ্ট না হতো, তবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ হয়তো এমন তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ত না। দেরিতে হলেও আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায় বাংলাদেশের আইনি অবস্থানের নৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও আর্থিক ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণটি একেবারেই নগণ্য।







