বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে প্রবাসীদের জন্য নগদ প্রণোদনা ও বিডার সংস্কার পরিকল্পনা

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি দেশে বিদেশি মূলধন বা ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, তবে সেই বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট অংশ তাকে নগদ প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করা হবে। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস।

নতুন এই নীতিমালার আওতায় কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করলে তিনি মোট বিনিয়োগের ওপর ১ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা লাভ করবেন। বিষয়টি অনেকটা প্রবাসী আয়ের ওপর বিদ্যমান নগদ সহায়তার মতোই কাজ করবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে শিল্প ও ব্যবসা খাতে বড় বিনিয়োগ আনতে উৎসাহিত করা। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো প্রবাসীর প্রচেষ্টায় ১০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিনিয়োগ দেশে আসে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ অর্থ স্বীকৃতিস্বরূপ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হবে। সরকারের মতে, প্রবাসীরা তাদের বসবাসরত দেশগুলোর ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ মহলে অত্যন্ত সুসংগঠিত। তাদের এই ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের একটি আদর্শ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। যদিও বিডার পক্ষ থেকে এটি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে, তবে এর পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

বিনিয়োগের পরিবেশ আরও গতিশীল করতে বিডা দেশের বাইরেও নিজস্ব শাখা অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে চীনে একটি অফিস খোলা হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো একটি দেশে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিদেশের অফিসে প্রচলিত বেতন কাঠামোর পরিবর্তে সাফল্যভিত্তিক বা কমিশন ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ আকর্ষণে কর্মকর্তারা যতটা সফল হবেন, তার ওপর ভিত্তি করেই তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা কর্মকর্তাদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার দেশের ছয়টি প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে একটি ‘একক ছাতা’ বা সিঙ্গেল আমব্রেলা কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপ অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিডা, বেজা, বেপজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পিপিপি কর্তৃপক্ষ এবং বিসিককে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হবে। বর্তমানে এই প্রতিটি সংস্থার নেতৃত্বে সরকার প্রধান থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নিয়মিত বোর্ড সভা করা সম্ভব হয় না, যা বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি সৃষ্টি করে। একীভূত এই নতুন কাঠামোর ফলে নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে। যদিও এর আইনগত ও কাঠামোগত কাজগুলো সম্পন্ন হতে আরও সময় লাগবে এবং এটি সম্ভবত পরবর্তী সরকারের সময়ে পূর্ণ রূপ পাবে, তবে বর্তমান প্রশাসন এর নকশা ও মৌলিক ভিত্তি তৈরির কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এছাড়া সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও পেশাদার করতে বিশেষায়িত বিনিয়োগ ব্যাংক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও সভায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top