আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নিশ্চিত হয়েছে যে, আসন্ন ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে না বাংলাদেশ। ভারতের মাটিতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিসিবি সেখানে সফর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর, দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্কটল্যান্ডকে বাংলাদেশের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। শনিবার এক বিশেষ বিবৃতিতে আইসিসি জানিয়েছে, নির্ধারিত সূচি ও ভেন্যুর কোনো পরিবর্তন করা টুর্নামেন্টের স্বার্থে সমীচীন হবে না বলেই তারা এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আইসিসির এই ঘোষণার আগেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, বিসিবিকে ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো লাল-সবুজ পতাকাকে ছাড়াই মাঠে গড়াতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে বড় এই আসর।
বিশ্বকাপের গ্রুপ বিন্যাসে বাংলাদেশ ছিল ‘সি’ গ্রুপে, যেখানে তাদের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল ও ইতালির মতো দলগুলো। এখন লিটন-শান্তদের পরিবর্তে এই গ্রুপে খেলবে ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে চতুর্থ হওয়া স্কটল্যান্ড। বিসিবির প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল; এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্কটিশরাই সেই একই ভেন্যুগুলোতে মাঠে নামবে। বাংলাদেশের মতো একটি টেস্ট খেলুড়ে এবং ক্রিকেট পাগল দেশ এই আসর থেকে ছিটকে যাওয়ায় পরবর্তী আসরগুলোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করার পথও টাইগারদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। এই অনুপস্থিতি কেবল একটি টুর্নামেন্ট হারানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থানের ওপর বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে বিগত সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার শীতল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। উত্তেজনার পারদ আরও চড়ে যখন নিরাপত্তার অজুহাতে আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিসিবি জোরালো দাবি তোলে যে, ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি একজন খেলোয়াড়ের জন্যই পর্যাপ্ত না হয়, তবে পুরো দলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। তাই তারা বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আইসিসি বাংলাদেশের এই নিরাপত্তাজনিত যৌক্তিক দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে কার্যত ভারতের অনড় অবস্থানের পক্ষেই রায় দিল।
ক্রিকেট বিশ্বের একটি বড় অংশ আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে দেখছে। যেখানে পাকিস্তানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা ভেন্যু পরিবর্তনের নজির রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের কোটি ভক্তের আবেগকে তোয়াক্কা না করে আইসিসি তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক একটি ক্রীড়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একক আধিপত্যেরই আরেকটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। শেষ পর্যন্ত মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনীতিতে হেরে গেল বাংলাদেশের ক্রিকেট, যা ভক্তদের জন্য এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে।







