উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবায় বিপ্লব: নীলফামারীতে নির্মিত হচ্ছে চীনের অনুদানে ১০০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল

উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবা খাতের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে এক বিশাল মাইলফলক অর্জিত হতে যাচ্ছে নীলফামারী জেলায়। চীন সরকারের প্রায় শতভাগ অনুদানে ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ এই জেলাতেই নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও পঞ্চগড়সহ প্রায় ২০টি জেলার তীব্র আবেদন ও নানা যৌক্তিকতা যাচাই-বাছাই শেষে ভৌগোলিক অবস্থান এবং অবকাঠামোগত সুবিধার বিচারে নীলফামারীকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসচিব সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, জেলাটিতে উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অভাব থাকায় এবং সরকারের কাছে পর্যাপ্ত খাসজমি থাকায় এই প্রকল্পটির জন্য নীলফামারীই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। চীন সরকার এই মেগা প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করে দেবে এবং বাংলাদেশ সরকার সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবে।

প্রকল্পের আর্থিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিশাল হাসপাতালটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকাই আসবে চীন সরকারের অনুদান হিসেবে, আর অবশিষ্ট ৭৩ কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে ২০২৮ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পন্ন করবে। উল্লেখ্য যে, এই হাসপাতালটি নিজের জেলায় নিতে গত দুই বছর ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক জনদাবি ও মানববন্ধন হলেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক ও কারিগরি সমীক্ষায় নীলফামারীই জয়ী হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন সভার তথ্য অনুযায়ী, এই হাসপাতালের নকশা ও সুযোগ-সুবিধা হবে আন্তর্জাতিক মানের। ১০ তলা বিশিষ্ট মূল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও অধ্যাপকদের জন্য আলাদা ১০ তলা আবাসিক ভবন, নার্সদের জন্য ৬ তলা ডরমিটরি এবং কর্মচারীদের জন্য পৃথক ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। অত্যাধুনিক এই চিকিৎসাকেন্দ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ ভবন, সার্ভিস ভবন এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য একটি হেলিপ্যাড ও অটোমেটেড অ্যাম্বুলেন্স সিস্টেম থাকবে। প্রকল্পের নথিপত্র বলছে, কেবল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কিনতেই ব্যয় হবে ৯৪৫ কোটি টাকা এবং ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ৮০২ কোটি টাকা। এছাড়া সোলার প্যানেল ও সিসিটিভিসহ আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নীলফামারী জেলা সদরের দাড়োয়ানীতে অবস্থিত সুতাকলের পরিত্যক্ত ২৫ একর জমিতে এই হাসপাতালটি গড়ে তোলা হবে। এর পাশেই উত্তরা ইপিজেড এবং বিজিবি ক্যাম্প থাকায় এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রেলওয়ে জংশনের সুবিধা থাকায় রোগীদের যাতায়াত অত্যন্ত সহজ হবে। বিশেষ করে ইপিজেডে কর্মরত চীন দেশের নাগরিকেরা এবং আশপাশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এই বিশেষায়িত হাসপাতালের সরাসরি সুফল ভোগ করবে। এনএপিডির সমীক্ষা অনুযায়ী, এই হাসপাতালটি চালু হলে দৈনিক প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষ সেবার আওতায় আসবে এবং ইনডোরে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে প্রায় দেড় হাজার দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হবে।

এই হাসপাতালটি স্থাপিত হওয়ার ফলে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস এবং মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য সমস্যার উন্নত চিকিৎসা স্থানীয়ভাবেই সম্ভব হবে, যার জন্য আগে মানুষকে অনেক টাকা খরচ করে দূরবর্তী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হতো। সমীক্ষায় প্রস্তাবিত ফি-র তালিকা অনুযায়ী, বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর খরচ ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে রাখা হবে এবং সাধারণ রক্ত পরীক্ষার খরচ হবে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল কেবল প্রাণহানিই কমাবে না, বরং নীলফামারীসহ পুরো উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনমান ও চিকিৎসাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top