আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে এক নজিরবিহীন কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিএনপি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও যারা দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে অনড় রয়েছেন, তাদের সবাইকে একযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই গণ-বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার দায়ে এসব নেতাদের দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির এই শুদ্ধি অভিযানটি দেশের আটটি বিভাগেই সমানভাবে কার্যকর করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, রংপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বিভাগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রভাবশালী নেতা বহিষ্কারের তালিকায় পড়েছেন। বিদ্রোহীদের মধ্যে কেবল স্থানীয় পর্যায়ের নেতা নন, বরং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং জেলা পর্যায়ের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এই কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্ব একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দলের স্বার্থ ও ঐক্য বজায় রাখতে নেতৃত্বের উচ্চপর্যায় থেকেও ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে টাঙ্গাইল-৩ আসনের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুৎফর রহমান খান আজাদ এবং নাটোর-১ আসনের কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর মতো হেভিওয়েট নেতাদের নাম এই তালিকায় থাকা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিভাগওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগে বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক বেশি। নাটোরে এক বিচিত্র পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে নাটোর-১ আসনের ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র দশ মিনিট পরে প্রত্যাহারের আবেদন নিয়ে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু আইনি জটিলতায় তা গৃহীত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকেও বহিষ্কারের তালিকায় নাম লেখাতে হয়েছে। এছাড়া পাবনা, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং কুমিল্লা অঞ্চলেও দলের তৃণমূল ও জেলা পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগেও এই তালিকায় বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতার নাম রয়েছে, যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করছিলেন।
দলীয় এই আদেশের ফলে বহিষ্কৃত নেতারা এখন থেকে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না এবং তাদের নির্বাচনে বিএনপির নাম বা প্রতীক ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকবে না। মূলত নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াই শুরু হওয়ার আগেই নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিতে এবং ভোটারদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি যেন তৈরি না হয়, সেই লক্ষ্যেই বিএনপি এই বিশাল সংখ্যক নেতাকে দল থেকে সরিয়ে দিল। এই বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনে দলের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।







