দীর্ঘ ১২ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেছে। এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং যুগান্তকারী দিক হলো সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার জোরালো সুপারিশ। অর্থাৎ, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে উভয় স্তরেই বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই কমিশন নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে গঠিত এই কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৬ মাস সময় দেওয়া হয়েছিল, যার সময়সীমা ছিল আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দক্ষতা ও মিতব্যয়িতার এক অনন্য নজির স্থাপন করে কমিশন তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে এই বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদন গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং একে একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন, এই নতুন কাঠামো দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করে সরকারি কর্মচারীদের মনে নতুন উদ্দীপনা জোগাবে।
কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গত এক দশকে বিশ্ব ও জাতীয় অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জীবন নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ১৮৪টি সভা এবং প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সরাসরি ও অনলাইন মতামতের ভিত্তিতে এই ২০ স্তরের বেতন স্কেল সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় একটি আর্থিক চ্যালেঞ্জ হবে, কারণ এটি কার্যকর করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে সরকারের মোট ব্যয় যেখানে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে এই বিশাল অংকের আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি এই প্রতিবেদনে প্রশাসনিক সংস্কারের বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সার্ভিস কমিশন গঠনের মতো বিষয়গুলো এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, বেতন গ্রেডের যৌক্তিক বিন্যাস এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের জন্য বিশেষ মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখাও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে তা কেবল সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানই উন্নত করবে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।







