বগুড়া জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরাধীনতা ও ভোটাধিকার হরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার এ দেশের মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়নি। কখনো রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীহীন প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, আবার কখনো ‘আমি আর ডামি’ প্রার্থীদের মাধ্যমে ভোটারদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর দেশের মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে এবং রাষ্ট্রকে বিদেশের কাছে নতজানু করে অবৈধভাবে ক্ষমতা ভোগ করা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে প্রাপ্ত নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে অভিহিত করে ড. আসিফ নজরুল বলেন, ছাত্র-জনতার অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়েছি যেখানে মানুষ নিজেই তার প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি অন্যের অধিকারের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কাউকে ভোট দিতে বাধা দেওয়া বা নির্বাচনি প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার চেষ্টা করা মানেই হলো সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী মানসিকতাকে ধারণ করা। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি কেউ অন্যের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তিনি প্রকারান্তরে শেখ হাসিনার পথই বেছে নিচ্ছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এবারের নির্বাচনে দুটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের কথা উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটের মাধ্যমে দেশের সরকার গঠনে ভূমিকা রাখছেন। একই সাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ‘গণভোট’ বা রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অতীতের ‘আয়নাঘর’ সংস্কৃতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গায়েবি মামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেতাদের সুচিকিৎসা না পাওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাগুলো যেন আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, আগামীতে ব্যাংক লুটপাট বা বিদেশে অর্থ পাচার রোধ করার পাশাপাশি ভারতের প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিহার করে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র গঠন করা হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে আয়োজিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এই ভোট কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক স্বার্থে। বৈষম্য, নিপীড়ন এবং দীর্ঘদিনের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে প্রতিটি নাগরিককে সংস্কারের পক্ষে সায় দিতে হবে। জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান ও পুলিশ সুপার শাহাদত হোসেনসহ সুধীসমাজ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এই সভায় তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান সময়টি দেশ পাল্টে দেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ, যা সফল করার দায়িত্ব প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের।







