এক বৈষম্যহীন, ন্যায়বিচারভিত্তিক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে হতে যাওয়া গণভোটে অংশ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দেওয়ার অনুরোধ জানান। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত এই ভাষণে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে দরজা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে, সেই পথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি এখন সাধারণ নাগরিকের হাতে। তিনি কেবল নিজেকেই নয়, বরং পরিচিত সবাইকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে সিল দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের এই মহাযজ্ঞে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে জাতির ইতিহাসের এক অনন্য ও অসাধারণ অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার যে অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে টেকসই করতে সুদূরপ্রসারী সংস্কার অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট বা সম্মতি প্রয়োজন বলেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। ড. ইউনূসের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ হলো শোষণ ও নিপীড়নের পুরনো কাঠামো ভেঙে একটি আধুনিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, এই সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো সরকারই একক ইচ্ছায় সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; বরং যে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
এই ঐতিহাসিক সংস্কার প্রস্তাব বা জুলাই সনদের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা জানান, সংস্কার কার্যকর হলে একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সংসদে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন করা হবে এবং বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনের বিধান রাখা হবে। এছাড়া বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই সনদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস এবং দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের অবাধ সুযোগও সীমিত করা হবে। পরিশেষে, দেশ পাল্টে দেওয়ার ডাক দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস এক গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, ইনশাআল্লাহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে এক মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।







