বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভাটি পরিণত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আবেগঘন মিলনমেলায়। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এই শোকসভায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, বুদ্ধিজীবী এবং পেশাজীবীরা এক সুরে প্রয়াত এই নেত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বক্তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর সেই চিরস্মরণীয় উক্তি— ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু প্রভু নেই’—আজও দেশের মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রেরণা হিসেবে অনুরণিত হচ্ছে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকাই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
ব্যতিক্রমী এই নাগরিক শোকসভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যে, সেখানে রাজনৈতিক কোনো বক্তৃতা নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের হৃদয়ের আকুতি উঠে এসেছে। এমনকি মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কিংবা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য কোনো বক্তব্য দেননি, যা ছিল প্রয়াত নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার এক নীরব বহিঃপ্রকাশ। সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহর মূল উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে বেগম জিয়ার ওপর বিগত দিনে হওয়া অবিচারের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, যে নেত্রীকে একসময় ভুয়া মামলায় সাজা দিয়ে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ তিনিই গণমানুষের হৃদয়ে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ড. নজরুল আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সততা ও সাহসিকতা আগামী প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
শোকসভায় বক্তারা বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেন—তাঁর কঠিন সময়ে রাজনীতিতে অভিষেক, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা এবং জীবনের শেষ দুই দশক নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিক রেহমান এবং দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান তাঁকে শেরে বাংলা ফজলুল হক বা মওলানা ভাসানীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সমান্তরালে স্থান দেন। তাঁরা বলেন, ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের যে অভাবনীয় ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তাঁর বক্তব্যে বেগম জিয়ার শেষ বাণীর ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যেখানে তিনি প্রতিশোধ বা ধ্বংসের বদলে ক্ষমা এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ব্যবসায়ী ও গবেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর শাসনামলে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের সাফল্যের কথা। সবশেষে, সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করার জোর দাবি জানিয়ে সভার সমাপ্তি টানেন।







