বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক দুই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলবার্ট গোম্বিস এবং মর্স ট্যানের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই দেশে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়সীমা নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধা বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণার পরপরই একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য মূলত সেই সব মহলের জন্য একটি কড়া জবাব, যারা নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গুজব ছড়িয়ে আসছিল।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো ‘ভুয়া খবরের বন্যা’ এবং ডিজিটাল অপতৎপরতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থকেরা ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশায় এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ও নানাবিধ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দেশের সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা এই ‘ডিজিটাল কুয়াশা’ ভেদ করে সত্যকে শনাক্ত করতে পারছে। ড. ইউনূস স্পষ্ট করেন যে, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভোটাররা একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে বাংলাদেশে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ বা সত্য ও সমঝোতা কমিশন গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে। মার্কিন কূটনীতিকদের এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন যে, প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার বন্ধু হিসেবে তিনি এই প্রক্রিয়াটি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে সেই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, অপরাধীদের মধ্যে অপরাধের জন্য কোনো ন্যূনতম অনুশোচনা বা অনুতাপ নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত তরুণদের রক্ত নিয়ে যারা এখনো অস্বীকারের অবস্থানে রয়েছে এবং অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের সঙ্গে এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, জুলাই সনদ এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মাধ্যমে দেশে যে নতুন গণতান্ত্রিক যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে, সেটিই হবে ভবিষ্যতে স্বৈরাচার ঠেকানোর স্থায়ী রক্ষাকবচ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই ফলপ্রসূ বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদও উপস্থিত ছিলেন।







