নির্বাচনি সমীকরণে টানাপোড়েন: জামায়াতের সাথে দূরত্ব ও নতুন জোটের ইঙ্গিত ইসলামী আন্দোলনের

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর জোটে বড় ধরণের ফাটল ও নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সাথে আসন সমঝোতা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার জেরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণের ইঙ্গিত দিয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত অনেক কিছুই ঘটতে পারে। মূলত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আজই সম্মিলিত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কথা থাকলেও আসন ভাগাভাগি নিয়ে চরম অসন্তোষের কারণে সেই নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের সাংগঠনিক শক্তির বিচারে অন্তত ৫০টি আসন দাবি করছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ৪০টির বেশি আসন ছাড়তে নারাজ। এই ১০টি আসনের দাবি নিয়ে তৈরি হওয়া রশি টানাটানির ফলেই দীর্ঘদিনের জোটবদ্ধ পথচলায় এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। গাজী আতাউর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ইসলামী আন্দোলন অতীতেও কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও কোনো ধরণের অবহেলা সহ্য করবে না। বর্তমানে তাঁরা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘মজলিসে আমেলা’র মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন এবং ‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন।

তবে এই দূরত্বের পেছনে কেবল আসন সংখ্যা নয়, বরং জামায়াতের সাথে বিএনপির ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকেও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সাথে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বৈঠক এবং ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি করেছে। গাজী আতাউর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন যে, জামায়াত কি শেষ পর্যন্ত বিগত আমলের জাতীয় পার্টির মতো কোনো প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে কি না। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার তৈরি করা ‘ঐক্যের পাটাতন’ মেরামত করার বিষয়ে জামায়াত প্রধানের বক্তব্যকে চরমোনাই পীরের দলটির অনেক নেতাই বাঁকা চোখে দেখছেন। এই আদর্শিক অমিল জোটের ফাটলকে আরও প্রশস্ত করেছে।

এমতাবস্থায় ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে লড়বে নাকি নতুন কোনো জোট গঠন করবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। তবে গাজী আতাউর রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, তাঁরা বর্তমানে ১২ দলীয় জোটের কিছু সদস্য এবং অন্যান্য সমমনা ইসলামী দলগুলোর সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। জামায়াতের সাথে সমঝোতার পথ এখনো পুরোপুরি রুদ্ধ না হলেও ইসলামী আন্দোলন তাদের সম্মান ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তারা মনে করছে, যদি কোনো দল বা জোট তাদের অবহেলা করে, তবে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পথ বেছে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক ঘটনাবলিই বলে দেবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই শক্তিশালী ইসলামী শক্তির অবস্থান ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top