পোস্টাল ব্যালটে ‘ধানের শীষের’ অবস্থান ও কারচুপি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে বিএনপির উদ্বেগ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পোস্টাল ব্যালট পেপারে নিজেদের নির্বাচনি প্রতীক ‘ধানের শীষের’ অবস্থান এবং প্রবাসীদের ব্যালট নিয়ে সৃষ্ট নানা অসংগতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসে দলটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। বৈঠকের নেতৃত্ব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি অভিযোগ করেন যে, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীকের বিন্যাস অত্যন্ত সুকৌশলে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। যেখানে অন্য কিছু দলের নাম ও প্রতীক প্রথম সারিতে রাখা হয়েছে, সেখানে বিএনপির প্রতীকটি রাখা হয়েছে ব্যালটের মাঝামাঝি স্থানে। নজরুল ইসলাম খানের মতে, এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়; বরং কাগজ ভাঁজ করার কৌশলে যাতে ভোটারদের চোখে ধানের শীষ সরাসরি না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই এমন পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। যেসব দেশে এখনো ব্যালট পাঠানো হয়নি, সেখানে দ্রুত সংশোধনী আনার জোর দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বিএনপি প্রতিনিধিদল প্রবাসে বিশেষ করে বাহরাইনে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়টি কমিশনের নজরে আনেন। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে পোস্টাল ব্যালট রয়েছে, যা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন যে, কমিশনও বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং স্থানীয় দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ নিচ্ছে। তবে বিএনপি চায় কেবল এনআইডি ব্লক করা নয়, বরং যারা এমন কারচুপির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি রাজনৈতিক দল বর্তমানে সাধারণ ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে, যা মূলত ভোট কেনাবেচা বা ভুয়া ভোটার তৈরির একটি অশনিসংকেত। কমিশন এই অভিযোগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলেও তিনি জানান।

বৈঠকে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনের ‘দ্বিমুখী নীতি’ নিয়েও সরব ছিল বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন যে, ইসির অনুরোধে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর পূর্বনির্ধারিত উত্তরবঙ্গ সফর স্থগিত করলেও দেশের অন্য বড় দলগুলোর নেতারা নিয়মিত জনসভা করে ভোট চাইছেন, অথচ সেখানে কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া আসন্ন সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি জানান যে, বিএনপি সংস্কারের পক্ষে এবং তাদের অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত হলো ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির কিছু সমর্থক ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তবে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন তিনি। একই সাথে সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালানোকে আইনি দৃষ্টিতে জায়েজ মনে করা হলে অন্যদের প্রচারণাকেও স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও নির্বাচন কমিশনকে উদার হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান যুক্তি দেন যে, সংবিধান অনুযায়ী কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তিনি নির্বাচন করার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। কিন্তু বর্তমানে আপিল শুনানিতে যেভাবে প্রার্থিতা বাতিল হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য বলে মনে করে দলটি। বিশেষ করে অতীতে দুঃশাসনের কারণে যারা বিদেশে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এখন নাগরিকত্ব ছেড়ে ফিরে এসে নির্বাচনে লড়ছেন, তাদের অধিকার হরণ করা সমীচীন নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বগুড়া-১ আসনে বিএনপির দুজন প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, আইনি মারপ্যাঁচে একজনের প্রার্থিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে। বিএনপির এই প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন ইসমাইল জবিউল্লাহ, মোহাম্মদ জকরিয়া এবং অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস কাজল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top