বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হাতে এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট তুলে দেন কমিটির প্রধান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। রিপোর্ট হস্তান্তরের পর এক জনাকীর্ণ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান যে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে সাজানো একটি সুগভীর মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই এই নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল, যার প্রাথমিক ও প্রধান ধাপ ছিল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা। কমিটির মতে, এই ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমেই মূলত জনগণের ভোটাধিকার হরণের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ওই নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনতে পারলেও, ভেতরে ভেতরে প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত করে রাখে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগকে জেতানোর জন্য এক ধরনের ‘অসৎ প্রতিযোগিতা’ শুরু হয়েছিল, যার ফলে অনেক কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়। নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়েছিল, যা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নির্দেশনায় পরিচালিত হতো।
২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের কৌশলও এই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল মূলত অংশগ্রহণহীন ও একতরফা, যেখানে ভোটারদের উপস্থিতির প্রয়োজনই মনে করা হয়নি। অন্যদিকে ২০২৪ সালে যখন বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে, তখন বিশ্ববাসীকে দেখানোর জন্য ‘ডামি প্রার্থী’ এবং দলের অভ্যন্তরীণ ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ দাঁড় করিয়ে এক কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করা হয়। বিচারপতি শামীম হাসনাইন জানান, এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি নির্দিষ্ট অংশকে অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি বিচার বিভাগকেও এই প্রক্রিয়ার সহযোগী করে তোলা হয়েছিল, যাতে বিরোধীরা মামলার জালে আটকে কোনোভাবেই নির্বাচনি মাঠে দাঁড়াতে না পারে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মূলত প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়াই ছিল এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।







