আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে এক নতুন সমীকরণের হাওয়া। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি যৌথ জনমত জরিপের ফলাফল বলছে, এবারের নির্বাচনে কোনো একক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের চেয়ে বরং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বা ‘হাড্ডাহাড্ডি’ লড়াই হতে যাচ্ছে। ‘প্রি-ইলেকশন পালস: ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশি ইলেকটোরেট’ শীর্ষক এই জরিপটি পরিচালনা করেছে প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভ। সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) জাতীয় প্রেসক্লাবের এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার তাদের পছন্দের শীর্ষে রেখেছেন বিএনপিকে, আর তার ঠিক পেছনেই ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। পরিসংখ্যানে এই ১ শতাংশের ব্যবধান মূলত দুই দলের মধ্যে জনপ্রিয়তার এক সমানে-সমান লড়াইকেই নির্দেশ করছে।
ভোটের সমীকরণ ও গেম-চেঞ্জার ভোটারদের ভূমিকা
এই জরিপে অন্যান্য দলের অবস্থানও বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৭ দশমিক ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য ছোট দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। তবে এবারের নির্বাচনের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখছেন সেই ১৭ শতাংশ ভোটার, যারা এখনো কাউকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। জরিপ বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই শেষ মুহূর্তে ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। মজার বিষয় হলো, এই দোদুল্যমান ভোটারদের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৩০ দশমিক ১৭ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না, যা দেশের প্রচলিত রাজনীতির প্রতি এক ধরনের নীরব অসন্তোষকেও প্রকাশ করে।
কেন ভোটাররা পছন্দ করছেন এই দলগুলোকে?
জরিপে ভোটারদের দল পছন্দ করার নেপথ্যে থাকা মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোও চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। যারা বিএনপিকে বেছে নিতে চাইছেন, তাদের মধ্যে ৭২ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার মনে করেন দলটির দীর্ঘ রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বর্তমান পরিস্থিতিতে খুবই জরুরি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থনের পেছনে সততা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলটির কঠোর অবস্থানের বিষয়টি ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। দলটির সমর্থকদের প্রায় ৪৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ কম দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া এবং ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ সততাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নতুন দল এনসিপির ক্ষেত্রে ৩৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোটার বিগত ‘জুলাই বিপ্লবে’ তাদের সক্রিয় ভূমিকার কথা মাথায় রেখে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
জরিপের পরিসর ও নির্ভরযোগ্যতা
এই বিশাল জনমত জরিপটি গত বছরের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের প্রায় ২২ হাজার ১৭৪ জন ভোটারের সরাসরি মতামত এতে প্রতিফলিত হয়েছে। জরিপ পদ্ধতি হিসেবে ‘স্ট্রার্টিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন’ অনুসরণ করা হয়েছে যাতে শহর, গ্রাম এবং বিভিন্ন জনসংখ্যার ভারসাম্যতা রক্ষা করা যায়। সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণালব্ধ তথ্য তুলে ধরেন আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতি এই জরিপের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবারের নির্বাচন কেবল ভোট নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে অভিজ্ঞতা বনাম সততার এক নতুন আদর্শিক লড়াই।







