গণমাধ্যমের নির্লিপ্ততা ও আগামীর সতর্কতা: তারেক রহমানের সভায় মাহমুদুর রহমানের তীক্ষ্ণ বক্তব্য

বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ ভয়, রাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত সুবিধাবাদের কাছে নতিস্বীকার করে নিপীড়িত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। শনিবার রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। মাহমুদুর রহমান তাঁর বক্তব্যে পেশাগত সৌজন্যবোধের অভাব নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন যে, বড় বড় মানুষেরা সাধারণত দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে অন্যের কথা না শুনেই চলে যান, যা অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক। তাই তিনি দীর্ঘ আলোচনার পথে না হেঁটে সরাসরি সেইসব ভাগ্যাহত ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের নাম উচ্চারণ করার সিদ্ধান্ত নেন, যাদের কষ্টের কথা বর্তমান সময়ের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে এড়িয়ে গেছে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি প্রয়াত সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীর অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পরও রুহুল আমিন গাজীকে মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি রাখা হয়েছিল এবং সুচিকিৎসার অভাব তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই কঠিন সময়ে দেশের নামী গণমাধ্যমগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব ছিল। একইভাবে তিনি প্রবীণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের প্রসঙ্গ টেনে জানান যে, ছাত্রলীগে কর্মীরা তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পর বছরের পর বছর কারাবরণ করতে হয়েছে। এমনকি স্ত্রীর মৃত্যুশয্যাতেও তিনি পাশে থাকার সুযোগ পাননি, অথচ সাংবাদিক সমাজ থেকে এর কোনো জোরালো প্রতিবাদ আসেনি। মাহমুদুর রহমান আরও উল্লেখ করেন ৮০ বছর বয়সী বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রহমানের কথা, যাকে এই বয়সেও জেলখানার মেঝেতে শুয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের সেই ভয়াবহ সময়ে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখাননি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মাহমুদুর রহমান সাংবাদিক কনক সরোয়ার এবং তাঁর পরিবারের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানের একটি বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করার ‘অপরাধে’ কনক সরোয়ারকে দীর্ঘকাল জেল খাটতে হয়েছে এবং তাঁর বোনকেও সাজানো মাদক মামলায় মাসের পর মাস কারান্তরালে রাখা হয়েছিল। এই বিষয়গুলোতেও তথাকথিত ‘বিবেকবান’ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এরপর তিনি সরাসরি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সতর্কবার্তা দেন। তিনি ১৯৭২ পরবর্তী সময়ের উদাহরণ টেনে বলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস না জেনে কেবল তাঁর চারপাশের লোকজন এবং বিদেশি শক্তির দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেশ চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন যে, দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকায় তিনি দেশের ভেতরের প্রকৃত চিত্র হয়তো পুরোপুরি জানেন না এবং বর্তমানে তাঁর চারপাশের নতুন ‘মিডিয়া বন্ধু’ বা বিশিষ্টজনরা তাঁকে যা বলছেন, সেটাই তিনি শুনছেন। মাহমুদুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের গত ১৭ বছরের প্রকৃত ইতিহাস অনেক বেশি জটিল ও ভিন্নতর। তিনি ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের গত ৫০ বছরের সেই বাস্তব ও অপ্রকাশিত ইতিহাস বিস্তারিতভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার অঙ্গীকার করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top