বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে এক নতুন ও শক্তিশালী সামরিক মেরুকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা এসএমডিএ (SMDA)-তে যোগ দিতে তুরস্ক এখন আলোচনার অত্যন্ত উন্নত ও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা’ নীতি; অর্থাৎ চুক্তিবদ্ধ কোনো একটি দেশের ওপর বহিঃশত্রুর আক্রমণকে বাকি সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং জোটবদ্ধভাবে তার মোকাবিলা করা হবে। তুরস্কের এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির চিরচেনা ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির পথ প্রশস্ত করছে।
তুরস্কের এই কৌশলগত পরিবর্তনের পেছনে একাধিক ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় এবং দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে আঙ্কারার স্বার্থের অভিন্নতা তুরস্ককে এই জোটে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বিদ্যমান। আঙ্কারা বর্তমানে পাকিস্তান নৌবাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করছে এবং দেশটির বিমানবাহিনীর এফ-১৬ বহরের আধুনিকায়নে সরাসরি যুক্ত। এছাড়া তুরস্ক তাদের পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক ‘কান’ (KAAN) যুদ্ধবিমান প্রকল্পে পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে যুক্ত করার বিষয়েও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই তিন দেশের ড্রোন প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রের সমন্বয় বিশ্বমঞ্চে মুসলিম বিশ্বের সামরিক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রিয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই এসএমডিএ চুক্তিটি ছিল কয়েক দশকের পুরনো বন্ধুত্বের এক আনুষ্ঠানিক ও শক্তিশালী রূপ। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই অনেক মুসলিম দেশ এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জাতীয় পরিষদে এই জোটকে একটি ‘ইস্টার্ন ন্যাটো’ বা প্রাচ্যের ন্যাটো হিসেবে অভিহিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি কেবল আত্মরক্ষার চুক্তি নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি বড় হাতিয়ার। তুরস্কের মতো সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তি এই জোটকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই প্রতিরক্ষা জোটের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে গেছে গত বছরের কিছু সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র আকাশযুদ্ধে পাকিস্তান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। ভারতের উসকানিমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে পাকিস্তান তিনটি অত্যাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমানসহ এক ডজন ড্রোন ভূপাতিত করে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল। এছাড়া একই বছরের অক্টোবরে আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীর উসকানিমূলক হামলার জবাবে পাকিস্তান অত্যন্ত নিখুঁত ও কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। আঞ্চলিক এই অস্থিতিশীলতা এবং বারবার সীমান্ত লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলোই মূলত পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে সম্মিলিত সুরক্ষার এই বৃহৎ ছাতার নিচে নিয়ে আসছে।







