আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা ও ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও বৈশ্বিক আইনের তোয়াক্কা না করার এক অভাবনীয় ঘোষণা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে আটকের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তাঁর পরিচালিত আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতাই’ যথেষ্ট, সেখানে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন তিনি দেখছেন না। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত দম্ভের সাথে উল্লেখ করেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞার অধীনে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য নন। ট্রাম্পের এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ও আইনি কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী অভিযানের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন কমান্ডোরা তুলে নিয়ে যায়, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ আধুনিক যুগের ‘রাষ্ট্রীয় অপহরণ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন থেকে ভেনেজুয়েলা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরিচালনা’ বা তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং দেশটির বিশাল খনিজ তেল ও জ্বালানি সম্পদ মার্কিন স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। এমনকি ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রধান দেলসি রদ্রিগেজকেও তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, ওয়াশিংটনের পরিকল্পনার সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে তাঁকে মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব কেবল ভেনেজুয়েলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি ইতিমধ্যেই কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগে গত জুন মাসে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়ে তিনি সরাসরি যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিলেন। পাশাপাশি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের পুরনো বাসনা বাস্তবায়নেও তিনি তৎপরতা জোরদার করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সাম্রাজ্যবাদী’ আচরণ রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোকে নিজ নিজ অঞ্চলে একই ধরনের আগ্রাসনে উৎসাহিত করবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বশান্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী ব্যর্থ হস্তক্ষেপের করুণ ইতিহাসের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক ইয়ান হার্ডের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে এক ভয়ানক বিপর্যয়কর পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top