গুম কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট: রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও পৈশাচিকতার এক হাড়হিম করা দলিল

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের দালিলিক প্রমাণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। রোববার (৪ জানুয়ারি ২০২৬) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই ঐতিহাসিক রিপোর্টটি জমা দেওয়া হয়। কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি এই ভয়াবহ পৈশাচিকতার খতিয়ান তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় মদতে সংগঠিত এই গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি অপরাধ। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা শেষ পর্যন্ত জীবিত ফিরে আসতে পেরেছেন, তাদের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ ছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, যারা আজও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপির এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই ১ হাজার ৫৬৯টি নিশ্চিত গুমের ঘটনার পেছনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে সরাসরি নির্দেশদাতার ভূমিকায় ছিলেন। তাঁর সঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এই ভয়াবহ তালিকায় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম এবং জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে ব্যক্তিদের ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) তথ্যও এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই অপরাধগুলো সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে লাশের নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে বিভৎস বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা শিউরে ওঠার মতো। কমিশনের তথ্যমতে, বরিশালের বলেশ্বর নদী ছিল লাশ গুম করার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে শত শত ব্যক্তিকে হত্যার পর ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জেও একই ধরনের লাশের গণকবরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে, যা ৪ থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক ভিক্টিম বা তাদের পরিবার এখনও ভয়ের কারণে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’-এর পাশাপাশি আরও গোপন বন্দিশালার ম্যাপিং করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

এই পৈশাচিকতার নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও কঠোর ভাষায় তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি এই কাজটিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, এটি কেবল একটি রিপোর্ট নয়, বরং গণতন্ত্রের লেবাসে একটি শাসকের পৈশাচিক আচরণের প্রামাণ্য দলিল। তিনি এই নৃশংস ঘটনাগুলোকে বাংলায় ‘পৈশাচিক’ শব্দ দিয়ে বর্ণনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, জাতি হিসেবে আমাদের এই অন্ধকার থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা এই রিপোর্টটিকে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top