বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের আবহ: চেয়ারপারসন পদ গ্রহণে তারেক রহমানের ‘ধীরে চলো’ নীতি

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় শোক কাটিয়ে রাজনীতির মাঠে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। দীর্ঘ চার দশক ধরে দলকে আগলে রাখা বেগম জিয়ার শূন্যতা পূরণে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এখন পূর্ণাঙ্গভাবে চেয়ারপারসন পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারেক রহমান এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে রাজি নন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে বেশি আগ্রহী। মূলত সদ্যপ্রয়াত মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং শোকের এই বিশেষ সময়টির স্পর্শকাতরতার কথা বিবেচনা করে তিনি এখনই এই আনুষ্ঠানিক পদোন্নতি কার্যকর না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তৃণমূলের সরাসরি জনমত, তাই শীর্ষ নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সরাসরি সমর্থনের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্যদের মতে, দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ উপধারা অনুযায়ী চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদে চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, ফলে নতুন করে কাউন্সিল ডাকার বাধ্যবাধকতা নেই। কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে এই মর্মে রেজল্যুশন বা প্রস্তাব পাসের পক্ষে অবস্থান নিলেও তারেক রহমান নিজে তাতে সায় দেননি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা প্রয়োজন। ১৯৮৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান থেকে চেয়ারপারসন হওয়ার যে ঐতিহাসিক পথযাত্রা ছিল, সেখানেও একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। তারেক রহমানও ১৯৮৮ সালে দলের সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়ে দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৮ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে সফলভাবে আন্দোলন ও দলের হাল ধরে আছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা এই নেতা এখন দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শীর্ষ পদে বসতে চান।

তারেক রহমানের এই সময়ক্ষেপণ বা তৃণমূলের রায়ের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাসকে দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি না হলেও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নেতৃত্বের এই পালাবদল কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বিএনপির নতুন যুগের সূচনা। গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী তারেক রহমান চেয়ারপারসনের সমুদয় দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা রাখলেও, মায়ের প্রতি শোক এবং তৃণমূলের আকাঙ্খাকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি যে ধৈর্য ও পরিপক্কতার পরিচয় দিচ্ছেন, তা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলের চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারপারসন হিসেবে অভিষিক্ত হবেন, তা দলীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে। আপাতত প্রিয় নেত্রীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত রাখাই তারেক রহমানের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top