দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যের নতুন ছক: অরুণাচলকে ‘কোর ইন্টারেস্ট’ বলছে বেইজিং

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে চীন ও ভারতের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার এক নতুন ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং এখন ভারতের অরুণাচল প্রদেশকে তাদের ‘কোর ইন্টারেস্ট’ বা অবিচ্ছেদ্য জাতীয় স্বার্থের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই তালিকায় অরুণাচলকে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোর সমতুল্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) মনে করে, ২০৪৯ সালের মধ্যে ‘চীনা জাতির মহান পুনরুজ্জীবন’ ঘটানোর যে লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করেছে, এই বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর একীকরণ তার একটি অনিবার্য ও প্রাকৃতিক চাহিদা। এই লক্ষ্য পূরণে বেইজিং একটি বিশ্বমানের সামরিক বাহিনী গড়ে তুলছে, যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুদ্ধ করতে সক্ষম।

পেন্টাগনের বিশ্লেষণে ভারত ও চীনের বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা বেইজিংয়ের সুদূরপ্রসারী কৌশলের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) থেকে সেনা প্রত্যাহারের যে চুক্তি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে মোদি-শি জিনপিংয়ের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তাকে চীন একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। বেইজিং মূলত সীমান্তের উত্তেজনা সাময়িকভাবে প্রশমিত করে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইছে, যাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর না হতে পারে। তবে এই ‘ট্যাকটিক্যাল কাম’ বা সাময়িক স্থিতিশীলতা সত্ত্বেও অরুণাচল ইস্যুতে তাদের অবস্থান বিন্দুমাত্র শিথিল হয়নি। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের কারণে ভারতও বেইজিংয়ের এই দ্বিমুখী কৌশলের বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।

প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রী। চীন বর্তমানে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দুই দেশ যৌথভাবে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান উৎপাদনের পাশাপাশি পাকিস্তান এখন চীনের তৈরি জে-১০সি বহুমুখী যুদ্ধবিমানের একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রেতা। এছাড়া নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও বেইজিং ইসলামাবাদকে আটটি ইউয়ান-ক্লাস সাবমেরিনসহ অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। পেন্টাগন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, জিবুতির পর পাকিস্তানই হতে পারে চীনের পরবর্তী বিদেশি সামরিক লজিস্টিক কেন্দ্র, যা এই অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতিকে আরও সংহত করবে। মূলত একদিকে ভারতের সাথে সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং অন্যদিকে পাকিস্তানকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার এই দ্বিমুখী নীতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top